বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ মার্চঃ কাছাড় জেলায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ওভারলোড কয়লা সিন্ডিকেট চক্র। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে প্রতিদিন শত শত অতিরিক্ত ওজনের কয়লা ও লাইম স্টোন বোঝাই ট্রাক অবাধে চলাচল করলেও রহস্যজনকভাবে কার্যকর কোনো কঠোর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন বিপদের মুখে পড়ছে গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়ক, অন্যদিকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বরাক উপত্যকার সাধারণ মানুষকে।
কিছুদিন আগেই গ্যামন সেতুর মারাত্মক ক্ষতির ঘটনায় তোলপাড় হয়ে উঠেছিল গোটা বরাক উপত্যকা। সেতুটির কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ব্যবস্থায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জরুরি পরিষেবা সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব পড়েছিল। সেই ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওভারলোড ট্রাক চলাচলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, নির্ধারিত ওজনের বেশি বোঝাই করে কোনো ট্রাককে জাতীয় সড়ক দিয়ে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেই সব প্রতিশ্রুতি এখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে আবারও নতুন উদ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে কয়লা ও লাইম স্টোন সিন্ডিকেট। প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক মেঘালয় দিক থেকে কাছাড়ের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ করছে। এসব ট্রাক জাতীয় সড়ক ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গ্যামন সেতু সহ ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি সেতুকে ঘিরে। সচেতন মানুষের অভিযোগ, নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি ওজন বহন করলে সেতুর ভেতরের কাঠামোর ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে এই চাপ অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। শুধু সেতুই নয়, এই ওভারলোড ট্রাকের কারণে জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশেও দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিচ্ছে। নতুন করে সংস্কার করা রাস্তার উপর দিয়ে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক চলাচল করায় রাস্তার স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। ফলে সরকারি অর্থে তৈরি অবকাঠামো অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এত চেকপোস্ট, প্রশাসনিক নজরদারি এবং পুলিশি টহল থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই বিপুল সংখ্যক ওভারলোড ট্রাক অবাধে চলাচল করছে? তাহলে কি কোনো প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়াতেই এই অবৈধ বাণিজ্য চলছে? সচেতন মহলের অভিযোগ, বিষয়টি আর হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ গ্যামন সেতুর অতীত অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের মনে তাজা। সেই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি হলে আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে বরাক উপত্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থা।
তাই অবিলম্বে প্রশাসনের কড়া নজরদারি এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। ওভারলোড ট্রাকের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান চালিয়ে এই অবৈধ সিন্ডিকেট চক্রকে রুখে না দিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সচেতন নাগরিকরা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ট্রাক থেকে প্রায় এক লক্ষ ষাট থেকে সত্তর হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে এই অবৈধ বাণিজ্য চালানো হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টিরও বেশি ট্রাক ও ড্যাম্পার মেঘালয় থেকে কয়লা ও লাইম স্টোন নিয়ে বরাক উপত্যকায় প্রবেশ করছে।

এত চেকগেট, পুলিশি টহল এবং প্রশাসনিক নজরদারি থাকার পরও কীভাবে এই বিপুল সংখ্যক ওভারলোড গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচল করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন, এই অবৈধ সিন্ডিকেট চক্র কি প্রশাসনের কোনো অংশের মদত ছাড়া সম্ভব? কারণ বাস্তব চিত্র বলছে, এত বড় আকারের অবৈধ পরিবহণ দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যত কোনো বড় ধরনের অভিযান বা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বুদ্ধিজীবীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাধারণত একটি ট্রাকের ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ টন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব ট্রাকে ৬০ টন পর্যন্ত অতিরিক্ত কয়লা ও লাইম স্টোন বোঝাই করা হচ্ছে। ফলে মোট ওজন দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮০ টন। এত বিপুল ওজন নিয়ে যখন ট্রাকগুলো গ্যামন সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করে, তখন সেতুর অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে ধীরে ধীরে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। এই চাপ দীর্ঘমেয়াদে সেতুর স্থায়িত্ব নষ্ট করে দেয় এবং যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করে।
শুধু সেতুই নয়, এই ওভারলোড ট্রাকের কারণে ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের বিভিন্ন অংশেও দ্রুত ভাঙন ধরছে। নতুন করে মেরামত করা রাস্তা কয়েক মাসের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন জনসাধারণের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মেঘালয় থেকে আনা এই কয়লা ও লাইম স্টোন কাছাড় জেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ডাম্প করে রাখা হচ্ছে।
জানা গেছে, দিগরখাল হাইস্কুল সংলগ্ন এলাকা, গুমড়া এলাকার করোউচুরা স্থিত ভারত পেট্রোলিয়াম পাম্পের পেছনের অংশ, গুমড়া–জালালপুর সড়কের পাশে সহ আরও একাধিক জায়গায় গড়ে উঠেছে কয়লা ও লাইম স্টোনের অবৈধ ডাম্পিং পয়েন্ট। এসব ডাম্প থেকে পরে ছোট ছোট ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় কয়লা সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
গ্যামন সেতু বিকল হওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে একাধিক নির্দেশ জারি করা হয়েছিল। অতিরিক্ত বডিযুক্ত ট্রাকের বডি কেটে ফেলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। প্রথমদিকে কিছুটা কড়াকড়ি দেখা গেলেও বর্তমানে সেই নির্দেশ কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে। অভিযোগ, সিন্ডিকেট চক্র আবারও ট্রাকের কেটে ফেলা অংশ নতুন করে জুড়ে বডি উঁচু করে ফেলেছে এবং ত্রিপল দিয়ে ঢেকে কয়লা পরিবহণ শুরু করেছে।
এই অবৈধ বাণিজ্যের ফলে শুধু অবকাঠামোর ক্ষতি হচ্ছে তা নয়, পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। কয়লার ধুলোয় দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি এই অবৈধ ব্যবসার কারণে প্রতি মাসে রাজ্য সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় আকারের অবৈধ সিন্ডিকেট চললেও এখনও পর্যন্ত শাসক দলের কোনো নেতা বা মন্ত্রীর স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। সচেতন মহলের একাংশের মতে, প্রশাসনের নীরবতা এই সিন্ডিকেট চক্রকে আরও সাহস জোগাচ্ছে।
বরাক উপত্যকার মানুষ ইতিমধ্যেই গ্যামন সেতু বিকলের দুর্ভোগ ভোগ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাজা। তাই এখনই যদি প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আবারও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তখন শুধু একটি সেতু নয়, গোটা যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে বরাকবাসীর একটাই দাবি, ওভারলোড কয়লা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর অভিযান চালিয়ে অবৈধ পরিবহণ বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের নামে গড়ে ওঠা অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাবে আর দুর্ভোগে পড়বে সাধারণ মানুষই।


