কালাইন ইন্দন পরিষেবা কেন্দ্র, নাকি ভোগান্তির আরেক নাম?

স্থানীয়দের বক্তব্য, নির্ধারিত খোলা থাকার দিনেও প্রায়শই গ্যাস সার্ভিস হঠাৎ বন্ধ রাখা হয়, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই। বহু মানুষ ভোরবেলা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দিনের শেষে খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এক সপ্তাহ, কোথাও কোথাও তারও বেশি সময় আগে টাকা জমা দিয়ে বুকিং করেও গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে রান্নাঘরে জ্বলছে না চুলা, দুর্ভোগে পড়ছে হাজারো পরিবার।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন সমাজের সবচেয়ে অসহায়, বয়স্ক মানুষ, দরিদ্র পরিবার, দিনমজুর, গ্রামীণ উপভোক্তারা। ৭০-৮০ বছরের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে, এ দৃশ্য শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, মানবিক সংবেদনশীলতারও চরম অবক্ষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

দূরবর্তী গ্রামাঞ্চল থেকে বহু মানুষ দিনের কাজ ফেলে গ্যাস নিতে এসে সারাদিন অপেক্ষা করেও ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। এতে শুধু সময় নষ্ট হচ্ছে না, অর্থনৈতিক ক্ষতিও হচ্ছে। একজন দিনমজুরের জন্য একদিনের কাজ হারানো মানে একদিনের অন্ন হারানো। অথচ এই বাস্তবতা যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

আরও বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ঘিরে। উপভোক্তারা দাবি করছেন, ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সদুত্তর মেলে না। কেউ ফোন ধরেন না, ধরলেও অস্পষ্ট উত্তর দিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের আস্থায় ধস নামাচ্ছে। তবে অভিযোগের সবচেয়ে অন্ধকার দিক উঠে এসেছে কৃত্রিম সংকট এবং সিন্ডিকেট রাজ এর প্রসঙ্গে।

স্থানীয়দের একাংশের গুরুতর অভিযোগ, কালাইন ইন্দনের কিছু কর্মীর মদতেই ইচ্ছাকৃতভাবে গ্যাসের সরবরাহ সীমিত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এর আড়ালে সক্রিয় একটি সিন্ডিকেট চক্র, যারা এই সংকটকে পুঁজি করে কালোবাজারি চালাচ্ছে। অভিযোগ আরও মারাত্মক  সরকারি লাইনে গ্যাস নেই, অথচ ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকা দিলেই কালোবাজারে সহজেই গ্যাস সিলিন্ডার মিলছে, এমনকি হোম ডেলিভারির সুবিধাসহ।

প্রশ্ন উঠছে, যদি কালোবাজারে এত সহজে গ্যাস পাওয়া যায়, তবে সরকারি পরিষেবায় কেন সংকট? কোথা থেকে আসছে এই সিলিন্ডার? কার ছত্রছায়ায় চলছে এই বাণিজ্য? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। উপভোক্তাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে হোম ডেলিভারি পরিষেবা নিয়ে।

সরকারি নীতিতে যেখানে গ্রাহকবান্ধব পরিষেবা দেওয়ার কথা, সেখানে কালাইন গ্যাস ইন্ধন ন্যূনতম ডেলিভারিও নিশ্চিত করতে পারছে না বলে অভিযোগ। অথচ যাদের বিরুদ্ধে কালোবাজারির অভিযোগ, তারাই বাড়ি পৌঁছে সিলিন্ডার সরবরাহ করছে, এ যেন সরকারি ব্যবস্থাকেই প্রকাশ্যে ব্যঙ্গ করা।

সরকার ইতিমধ্যে বুকিং-ভিত্তিক স্বচ্ছ নিয়ম চালু করেছে। বুকিংয়ের পর গ্রাহকদের মেসেজ দিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে গ্যাস সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু উপভোক্তাদের প্রশ্ন, এই ডিজিটাল ও স্বচ্ছ পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও কালাইনে এমন বিশৃঙ্খলা কেন? তাহলে কি সমস্যা কেবল সরবরাহে নয়, ব্যবস্থাপনার গভীর গলদে?

স্থানীয়দের বক্তব্য, এটি হঠাৎ তৈরি হওয়া ক্ষোভ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বিস্ফোরণ। বহুবার মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এতে মানুষের মনে প্রশ্ন উঠছে, কেউ কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দিচ্ছে?

ভুক্তভোগীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি নিছক গ্যাস সংকটের ঘটনা নয়; এটি জনসেবার কাঠামোগত দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির বড় ইঙ্গিত। যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা নিয়েই মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, সেখানে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব মারাত্মক।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে কাঠ, কয়লা বা বিকল্প জ্বালানিতে ফিরছে, যা শুধু ব্যয়বহুল নয়, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর। অথচ উজ্জ্বলা থেকে শুরু করে নানা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার যে “পরিষ্কার জ্বালানি বিপ্লব”-এর কথা বলছে, কালাইনের বাস্তবতা যেন সেই দাবিকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

এখন বড় প্রশ্ন, প্রশাসন কি এই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে নামবে? কালোবাজারি, সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট, এই অভিযোগগুলো কি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হবে? নাকি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ক্ষুব্ধ উপভোক্তারা ইতিমধ্যেই আসাম সরকারের কাছে দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং গ্যাস পরিষেবায় পূর্ণ স্বচ্ছতা দাবি করেছেন।

পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথেও নামতে বাধ্য হবেন। এখন দেখার, সরকার ও প্রশাসন এই ক্ষোভের ভাষা পড়তে পারে কিনা। কারণ মানুষের দাবি খুবই সাধারণ, ভিক্ষা নয়, অধিকার হিসেবে নিয়মিত ও স্বচ্ছ গ্যাস পরিষেবা। আর সেই দাবিকে আর কতদিন উপেক্ষা করা যায়, সেটাই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।

Related Posts

শিলচরের লাইফলাইন মরণফাঁদে পরিণত! প্রশাসনিক উদাসীনতায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম যোগাযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড আজ যেন অবহেলা, ভোগান্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই…

শিলচর পলিটেকনিক্যাল কলেজের সামনে ফুটপাত দখল করে জুয়ার আসর!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজার হাজার মানুষ রোগী ও তাঁদের পরিজন, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী…