শিলচরের লাইফলাইন মরণফাঁদে পরিণত! প্রশাসনিক উদাসীনতায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, রোগী, ছাত্রছাত্রী, চিকিৎসক, কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারী এই সড়কের উপর নির্ভরশীল। অথচ বাস্তব চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে, অনেকের মতে এটি এখন আর সড়ক নয়, এক চলমান মৃত্যুফাঁদ। বড় বড় গর্ত, উঠে যাওয়া পিচ, খানাখন্দে ভরা রাস্তা এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলমগ্ন পরিস্থিতি যাতায়াতকে করে তুলেছে অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মতো জরুরি পরিষেবার প্রধান সংযোগপথ হওয়া সত্ত্বেও এই রাস্তাটির এমন করুণ দশা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর সমস্যা জিইয়ে থাকলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ফলে উন্নয়নের দাবির আড়ালে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আজ বাস্তবেই প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক নগ্ন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সঙ্গে শহরের যোগাযোগের প্রধান ভরসা এই সড়ক। একইসঙ্গে এই পথ দিয়েই যাতায়াত করেন সরকারি পলিটেকনিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রী, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি) র শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, নার্স, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী এবং অসংখ্য রোগী ও তাঁদের পরিজন। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের অবস্থা আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চালানোই দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে।

রাস্তার সর্বত্র বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে পিচ, কোথাও জমে আছে নোংরা জল। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তাজুড়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, আর সেই জলের নিচে গর্ত কোথায় তা বোঝার উপায় থাকে না। ফলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দুই চাকার যানবাহন চালকদের জন্য তো এই রাস্তা কার্যত মরণফাঁদ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই অবস্থা চলছে। মাঝেমধ্যে খানাখন্দে সামান্য পাথর ফেলে মেরামতের নাটক করা হলেও স্থায়ী সমাধানের দিকে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। প্রশ্ন উঠছে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তাকে কেন এমন অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে? মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, অসুস্থ মানুষ নিয়ে এই রাস্তা পাড়ি দেওয়া এক যন্ত্রণার নাম।

অ্যাম্বুল্যান্স চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। রোগী নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। অনেকের অভিযোগ, গর্তে ধাক্কা খেয়ে রোগীর শারীরিক অবস্থাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

এক রোগীর পরিজনের ক্ষোভ, হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসতেই যদি এমন ভোগান্তি হয়, তাহলে এই রাস্তার দায় নেবে কে? জীবন-মরণের সঙ্গে জড়িত রাস্তার এমন অবস্থা লজ্জাজনক। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ আরও তীব্র। প্রতিদিন ক্লাসে যাওয়ার পথে ধুলো, কাদা, বৃষ্টির জমাজল আর যানজটের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।

পলিটেকনিক্যাল কলেজ ও এনআইটির বহু শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, বর্ষাকালে রাস্তাটি প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পরীক্ষার দিন কিংবা জরুরি ক্লাস থাকলেও সময়মতো পৌঁছানো দুষ্কর হয়ে ওঠে। এক ছাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, প্রযুক্তি শিক্ষার বড় বড় কথা বলা হয়, কিন্তু যে রাস্তায় কলেজে যেতে হয়, সেটাই যদি ধ্বংসস্তূপ হয়, তাহলে উন্নয়ন কোথায়?

অফিসগামী কর্মীদের কথায়ও উঠে এসেছে তীব্র ক্ষোভ। প্রতিদিন যানজটে আটকে সময় নষ্ট, গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট, বাড়তি জ্বালানি খরচ সব মিলিয়ে নিত্য দুর্ভোগ। অনেকের মতে, প্রশাসনের উদাসীনতার খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ করদাতা মানুষ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহুবার জনপ্রতিনিধি, পূর্ত বিভাগ ও প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নির্বাচন এলে প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, পরে সবকিছু আগের মতোই থেকে যায়। মানুষের প্রশ্ন, মেডিকেল কলেজ, এনআইটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সামনে এমন ভগ্নদশা কি কোনো উন্নয়নশীল শহরের চিত্র হতে পারে?

ক্ষোভ আরও বাড়ছে এই কারণে যে, শহরের কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দ্রুত রাস্তা সংস্কারের কাজ দেখা গেলেও এই জীবনরেখা সড়ক যেন পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষিত। এতে প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু একটি খারাপ রাস্তার সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। প্রতিদিন দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে হাজারো মানুষ চলাচল করছেন, অথচ দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ নীরব দর্শকের ভূমিকায়।

শহরবাসীর দাবি, অবিলম্বে মেডিকেল কলেজ রোডের পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণ, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সংস্কার প্রকল্প হাতে নিতে হবে। শুধু অস্থায়ী প্যাচওয়ার্ক নয়, স্থায়ী সমাধান চাই। কারণ প্রশ্ন একটাই, যে রাস্তা জীবন বাঁচানোর হাসপাতালের দিকে নিয়ে যায়, সেই রাস্তা নিজেই যদি মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়, তবে উন্নয়নের দাবিগুলো কি শুধুই কাগুজে প্রচার? এখন দেখার, প্রশাসন জাগে, নাকি জনদুর্ভোগের এই দীর্ঘ অধ্যায় আরও দীর্ঘতর হয়।

Related Posts

শিলচর পলিটেকনিক্যাল কলেজের সামনে ফুটপাত দখল করে জুয়ার আসর!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজার হাজার মানুষ রোগী ও তাঁদের পরিজন, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী…

শিলচর শহরের রাঙ্গিরখাল সংস্কার: স্থায়ী সমাধান, নাকি কংক্রিটের কসমেটিকস?

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের দীর্ঘদিনের জমাজলের সমস্যা দূর করতে বহু প্রতীক্ষিত রাঙ্গিরখাল সংস্কার প্রকল্প একসময় আশার আলো দেখিয়েছিল শহরবাসীকে। বর্ষা এলেই জলমগ্ন হয়ে পড়া রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, বাজার…