শিলচর শহরের রাঙ্গিরখাল সংস্কার: স্থায়ী সমাধান, নাকি কংক্রিটের কসমেটিকস?

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশাবাদ এখন রূপ নিচ্ছে সংশয়ে। প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, নির্মাণ পদ্ধতি এবং পরিকল্পনার ভিত্তি নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন শহরের সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত খাল সংস্কারের বদলে এই প্রকল্প যেন অনেকটাই দৃষ্টিনন্দন উন্নয়ন এর প্রদর্শনী হয়ে উঠছে, যার বাস্তব কার্যকারিতা এখনও স্পষ্ট নয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খালের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির মূল উপাদান খনন বা নাব্যতা ফিরিয়ে আনার কাজ নিয়ে দৃশ্যমান কোনও জোরালো উদ্যোগ নেই। বরং বিভিন্ন অংশে গার্ড ওয়াল নির্মাণের ফলে খালের আগের তুলনায় পরিসর সংকুচিত হচ্ছে বলেই অভিযোগ উঠছে। ফলে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে, খালের প্রস্থ কমিয়ে এবং গভীরতা না বাড়িয়ে কীভাবে জমাজলের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব? সচেতন মহলের একাংশের অভিযোগ, শুধুমাত্র কংক্রিটের গার্ডওয়াল নির্মাণকে জলনিকাশি সংস্কারের সমার্থক হিসেবে দেখানো হচ্ছে, অথচ জল প্রবাহের বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা অনেক জটিল।

খাল যদি যথাযথভাবে খনন না হয়, দখলমুক্ত না হয়, এবং জল বহনের ক্ষমতা না বাড়ে, তবে বর্ষার অতিরিক্ত চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অভিযোগ উঠছে, কোথাও কোথাও খালের দু’পাড়ের মধ্যবর্তী ব্যবধান কমিয়ে প্রায় নির্দিষ্ট একটি সীমায় আটকে ফেলা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। অনেকের মতে, এটি সমাধানের বদলে নতুন বিপদের ভিতও তৈরি করতে পারে।

শহরের প্রবীণ নাগরিকদের বক্তব্য, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। রাঙ্গিরখালের মতো শহরের প্রধান নিকাশি চ্যানেলকে ঘিরে পরিকল্পনা হওয়া উচিত ছিল পূর্ণাঙ্গ জল সমীক্ষা, বন্যা প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং বাস্তবভিত্তিক প্রকৌশল পরামর্শের ভিত্তিতে। কিন্তু সেই স্বচ্ছতা এখনও চোখে দেখার মত নেই বলেই অভিযোগ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তবায়নের ধীরগতি। বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্প হলেও কাজের অগ্রগতি অত্যন্ত মন্থর।

এতে যেমন প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তেমনই বাড়ছে জনঅসন্তোষও। শহরবাসীর বড় অংশের বক্তব্যে স্পষ্ট, রাঙ্গিরখাল শুধুমাত্র একটি খাল নয়, এটি শিলচরের জল নিষ্কাশনের প্রাণরেখা। এই খাল নিয়ে কোনও অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা পুরো শহরের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই এখন প্রশ্ন উঠছে, এই প্রকল্প কি সত্যিই জমাজলের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে এগোচ্ছে, নাকি উন্নয়নের মোড়কে তৈরি হচ্ছে আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায়?

শহরের সচেতন নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জল নিষ্কাশনের মূল চাবিকাঠি খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধি। অথচ প্রকল্পে খনন বা ড্রেজিংয়ের সুস্পষ্ট উদ্যোগ নেই। বহু বছরের পলি জমে রাঙ্গিরখালের তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, বিভিন্ন জায়গায় জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত। এই বাস্তবতায় শুধু দুপাশে কংক্রিটের দেওয়াল তুলে দিলে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। বরং অভিযোগ, গার্ড ওয়ালের মাঝখানে ৭ মিটার পরিসর রেখে যে নকশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে, তা খালের স্বাভাবিক প্রশস্ততাকেই কমিয়ে দিচ্ছে।

শহরের এক সচেতন নাগরিকের ভাষায়, প্রকল্পের নামে খালকে বাঁধাই করা হচ্ছে, কিন্তু খালের বহনক্ষমতা বাড়ানোর কোনও বাস্তব উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। আরও বিস্ময়কর অভিযোগ, এই ৭ মিটার পরিমাপের ভিত্তি কী? কোন হাইড্রোলজিক্যাল স্টাডি, কোন বন্যা-জল প্রবাহ সমীক্ষা, কোন প্রযুক্তিগত রিপোর্টের ভিত্তিতে এই পরিসর নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের জিরো পয়েন্ট নিয়েও। পুরনো লক্ষীপুর রোড থেকে খালের সূচনা ধরা স্বাভাবিক হলেও গার্ড ওয়াল নির্মাণ শুরু হয়েছে কনকপুরের কনক সংঘ ক্লাব সংলগ্ন এলাকা থেকে। প্রায় দেড় কিলোমিটার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ রেখে কেন প্রকল্প শুরু হল, তার উত্তর নেই কারও কাছে। অনেকের অভিযোগ, এই বাদ পড়া অংশই বর্ষাকালে জল নিষ্কাশনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে কোনও কাজ না করে মাঝপথ থেকে প্রকল্প শুরু করায় পুরো পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

কানাঘুষো আরও এক গুরুতর অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, ভোট রাজনীতির হিসাব কষে অনেক জায়গায় সরকারি জমি যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। অবৈধ দখল উচ্ছেদে প্রশাসন নরম মনোভাব নিয়েছে বলেও অভিযোগ। ফলে প্রকৃত খাল প্রশস্ত করার বদলে আপসের পথে গিয়ে সংকুচিত উন্নয়ন এর পথে হাঁটা হয়েছে। কনকপুরে দু-একটি উচ্ছেদ অভিযান হলেও তা ছিল নামমাত্র, এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। বরং অনেক জায়গায় আগের তুলনায় কার্যত কমে গেছে জল চলাচলের জায়গা।

প্রবীণ নাগরিকদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে প্রকল্পের ড্রইং ও ডিজাইনে অসঙ্গতি। নকশায় ৪ মিটার, সাড়ে ৪ মিটার এবং সওয়া ৫ মিটার তিন ধরনের গার্ড ওয়ালের উচ্চতা উল্লেখ থাকলেও কোথায় কোন উচ্চতার ওয়াল হবে, তার নির্দিষ্টতা নেই। ফলে প্রকৌশলগত স্বচ্ছতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। শুধু তাই নয়, এলাইনমেন্ট ড্রইংয়ের রেফারেন্স পয়েন্ট নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা।

এমনকি প্রকল্পের নিম্ন অববাহিকায় কাজ কতদূর যাবে, সেটাও পরিষ্কার নয়। বলা হচ্ছে তপোবন নগরের সানলিট হাসপাতাল সংলগ্ন সেতু পর্যন্ত কাজ হবে, কিন্তু তার পরবর্তী অংশের ভবিষ্যৎ কী সেটা অন্ধকারে। অভিযোগের পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ধীরগতির বাস্তবায়ন। গত প্রায় চার বছরে মাত্র এক কিলোমিটার মতো কাজ এগিয়েছে। এই গতিতে পুরো প্রকল্প শেষ হতে আর কত বছর লাগবে, তা নিয়েও মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

শহরবাসীর একাংশের মতে, এই প্রকল্প যেন জমা জলের সমস্যা নিরসনের চেয়ে বেশি কাগুজে উন্নয়ন এর উদাহরণ হয়ে উঠছে। কারণ খাল যদি নাব্যতা না পায়, দখলমুক্ত না হয়, বর্জ্যমুক্ত না হয়, এবং পূর্ণাঙ্গ জল সমীক্ষার ভিত্তিতে পুনর্গঠন না হয়, তবে কংক্রিটের গার্ড ওয়াল বর্ষার জল থামাতে পারবে না। বরং আশঙ্কা আরও ভয়াবহ সংকুচিত পরিসরে প্রবল বর্ষার জল আটকে গিয়ে উল্টো শহরে জমাজলের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

জল প্রবাহের গতিবিজ্ঞান উপেক্ষা করে যদি শুধু কাঠামোগত নির্মাণে জোর দেওয়া হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বিপজ্জনকও হতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞ মহলের একাংশের। প্রশ্ন উঠছে জবাবদিহি নিয়েও। এত বড় প্রকল্পে কি পূর্ণাঙ্গ টেকনিক্যাল ডিপিআর জনসমক্ষে প্রকাশ হয়েছে? হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং রিপোর্ট কোথায়? বন্যা নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? কেন জনশুনানি হয়নি? এসব প্রশ্ন এখন নাগরিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।

শিলচরের মতো জলাবদ্ধতা প্রবণ শহরে রাঙ্গিরখাল কেবল একটি নিকাশি খাল নয়, এটি শহরের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অবকাঠামো। তাই এই প্রকল্পে যেকোনও ত্রুটি বা ভুল পরিকল্পনার মূল্য দিতে হতে পারে গোটা শহরকে। এখন সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রকল্পের নকশা, সমীক্ষা, বাস্তব অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিক।

কারণ শহরবাসীর প্রশ্ন খুবই সরল শুধু গার্ড ওয়াল দিয়ে কি সত্যিই জমাজলের সমস্যা দূর হবে, নাকি এটি ভবিষ্যতের আরও বড় বিপদের ভিত্তি হয়ে উঠছে? সময়ের সঙ্গে সেই উত্তর মিলবে হয়তো। তবে আপাতত রাঙ্গিরখাল প্রকল্প ঘিরে প্রশ্নই যেন বেশি, আশ্বাস কম। রাঙ্গিরখাল ঘিরে এই বিতর্কের জবাব এখন চাইছে শহর। কারণ নাগরিকদের প্রত্যাশা শুধু গার্ড ওয়াল নয়, তাঁরা চান কার্যকর জলমুক্তির নিশ্চয়তা। আর সেই উত্তর এখন সময়ই দেবে।

Related Posts

শিলচরের লাইফলাইন মরণফাঁদে পরিণত! প্রশাসনিক উদাসীনতায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম যোগাযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড আজ যেন অবহেলা, ভোগান্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই…

শিলচর পলিটেকনিক্যাল কলেজের সামনে ফুটপাত দখল করে জুয়ার আসর!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজার হাজার মানুষ রোগী ও তাঁদের পরিজন, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী…