বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ কাঠাল রোড আজ কার্যত জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন হাজারো মানুষ স্কুলপড়ুয়া, কর্মজীবী, রোগী ও সাধারণ পথচারী এই সড়ক ব্যবহার করলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থা ও অবহেলায় রাস্তার বেহাল দশা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গর্তে ভরা রাস্তা, কাদা ও জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা অংশ, ভাঙাচোরা পিচের স্তূপ এবং চলাচলের অযোগ্য পরিস্থিতি জনজীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা আসার আগেই রাস্তার এই দুরবস্থা একাধিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই বড় বড় গর্ত জলমগ্ন হয়ে পড়ে, ফলে যানবাহন চালকদের পক্ষে বিপদ এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। প্রতিদিন স্কুলগামী ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
এই চরম দুরবস্থার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সরব হয় মহারিশি বিদ্যা মন্দির গার্ডিয়ান ফোরাম। সংগঠনের পক্ষ থেকে পূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এবং কাছাড়ের জেলা আয়ুক্তের কাছে পৃথকভাবে স্মারকলিপি পেশ করা হয়। স্মারকলিপিতে কাঠাল রোডের দ্রুত সংস্কার, জলনিকাশী ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং স্থায়ী সমাধানের দাবি জানানো হয়। গার্ডিয়ান ফোরামের বক্তব্য, এটি আর শুধুমাত্র একটি খারাপ রাস্তার সমস্যা নয়, এটি প্রতিদিনের এক সম্ভাব্য দুর্ঘটনার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
প্রশাসনের দীর্ঘ নীরবতা এবং দৃশ্যমান তৎপরতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সাময়িক মেরামতির নামে দায়সারা কাজ হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
ফলে বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় মহলের মতে, কাঠাল রোড শুধুমাত্র একটি রাস্তা নয়, এটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের শিরা। এই সড়কের বেহাল দশা শুধু যান চলাচল ব্যাহত করছে না, বরং শহরের নাগরিক পরিকাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে এনে দিচ্ছে।
ফোরামের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিলচর-হাইলাকান্দি সড়কের সংযোগস্থল কাঁঠালপয়েন্ট থেকে ভকতপুর পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তায় বড় বড় গর্ত এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কোথাও পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর খাদ, কোথাও আবার সামান্য বৃষ্টিতেই জমে থাকছে হাঁটুসমান জল। ফলে গাড়ি চালানো তো দূরের কথা, হেঁটে চলাও দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই পথ দিয়েই প্রতিদিন মহারিশি বিদ্যা মন্দিরসহ একাধিক সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত। ছোট ছোট পড়ুয়াদের নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক চরমে। একাধিক অভিভাবকের অভিযোগ, প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠানো মানে দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকা। কখন যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়, বলা যায় না।
রাস্তায় বড় বড় গর্ত ও জমাজলে নাজেহাল পথচারী, দ্রুত সংস্কারে দাবিতে পূর্ত বিভাগ ও জেলা আয়ুক্তের কাছে স্মারকলিপি
স্থানীয় বাসিন্দারাও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এই রাস্তাটির সংস্কারের দাবি জানানো হলেও বাস্তবে কোনও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। বর্ষা এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়—জলাবদ্ধতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গর্ত যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়।
গত ২২ এপ্রিল পূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অনিরুদ্ধ নাগের সঙ্গে এক বৈঠকে ফোরামের প্রতিনিধিরা বিষয়টি উত্থাপন করেন। সেখানে জানানো হয়, রাস্তাটির সংস্কারের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং এস ও পি ডি (জি) ২০২৫-২৬ প্রকল্পের আওতায় টেন্ডার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে?
আর ততদিন কি সাধারণ মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই চলাফেরা করতে হবে? বাস্তব চিত্র বলছে, কাগজে-কলমে প্রকল্প এগোলেও মাটিতে তার প্রতিফলন নেই। উন্নয়নের বড় বড় দাবির মাঝে একটি অত্যাবশ্যকীয় সড়কের এই করুণ দশা প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং গাফিলতিরই প্রমাণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। গার্ডিয়ান ফোরামের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, অবিলম্বে কার্যাদেশ জারি করে সংস্কার কাজ শুরু না হলে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা।
স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষের অভিযোগ মতে, এই ধরনের ব্যস্ত সড়কে দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া শুধু অব্যবস্থাপনার পরিচায়ক নয়, বরং জননিরাপত্তার প্রতি চরম অবহেলা। প্রতিদিনের যানজট, দুর্ঘটনার আশঙ্কা, শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
প্রশ্ন এখন একটাই, প্রশাসন কি আরেকটি দুর্ঘটনার অপেক্ষায়? নাকি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে কাঠাল রোডকে ফিরিয়ে দেবে নিরাপদ যাতায়াতের পথে, সেটাই এখন দেখার। অভিভাবক সমাজের এই প্রতিবাদ ও স্মারকলিপির পর প্রশাসন কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। কারণ কাঠাল রোডের বর্তমান অবস্থা আর অবহেলার বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।


