বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ অসমজুড়ে কেন্দ্রীয় প্রকল্প জল জীবন মিশন এর অধীনে কর্মরত কারিগরি কর্মকর্তা, জেলা সমন্বয়ক, বি ডব্লিউ সি এবং অন্যান্য চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছে। অভিযোগ, ২০২৬ সালের মার্চ মাসের পূর্ণ বেতন না পেয়ে বহু কর্মী পেয়েছেন মাত্র প্রায় ৫০ শতাংশ পারিশ্রমিক। শ্রীভূমি সহ রাজ্যের একাধিক জেলায় একই চিত্র দেখা যাওয়ায় বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রূপ নিচ্ছে বৃহত্তর কর্মী অসন্তোষে।
কর্মীদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁরা নানা বঞ্চনার শিকার। নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পরও বহু বছর ধরে বেতন কাঠামোয় কোনও সংশোধন হয়নি। তার ওপর গত এক বছর ধরে ভ্রমণ ভাতা (টিএ) বন্ধ থাকায় আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে। কর্মীদের দাবি, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে আজ পর্যন্ত টিএ বকেয়া রয়ে গেছে। অথচ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজে নিয়মিত ভ্রমণ, তদারকি ও মনিটরিং চালিয়ে যেতে হচ্ছে নিজেদের সামর্থ্যেই।
এই আর্থিক অনিশ্চয়তার আবহে বিহু ও অসমীয়া নববর্ষের মতো আবেগঘন উৎসবের মুখে অর্ধেক বেতন পাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ তীব্র হয়েছে কর্মীদের মধ্যে। অনেকে বলছেন, উৎসবের সময় যখন পরিবারে বাড়তি খরচ থাকে, ঠিক তখনই এই বেতন-কর্তন যেন তাঁদের প্রতি নির্মম আচরণের সামিল। এক কর্মীর কথায়, আমরা সরকারি প্রকল্প চালিয়ে রাখছি, গ্রামে গ্রামে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করছি, অথচ নিজেদের ঘরে নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কর্মীদের অভিযোগ, অর্ধেক বেতন হাতে আসায় বহুজন এখন ইএমআই, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং প্রতিদিনের যাতায়াতের খরচ মেটাতে চরম সমস্যায় পড়েছেন। অনেকের মতে, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকাও অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে। কারণ, ভ্রমণের ন্যূনতম খরচ জোগানোও দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, এটি কোনও দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াই। তাঁদের কথায়, আমরা কাজ ফাঁকি দিচ্ছি না, বরং সরকারি প্রকল্প সফল করতে দিনরাত পরিশ্রম করছি। অথচ আমাদের পরিশ্রমের মূল্যই যদি সময়মতো না মেলে, তাহলে কর্মীদের মনোবল কোথায় থাকবে? জল জীবন মিশন কেন্দ্রীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত।
গ্রামীণ পরিবারে নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে এই প্রকল্পে মাঠপর্যায়ে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের উপরেই নির্ভর করছে বাস্তবায়নের সাফল্য। অথচ সেই কর্মীদেরই আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা প্রশ্ন তুলছে প্রকল্প পরিচালনা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিয়ে।
কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, সমস্যা নতুন নয়, কিন্তু এবার তা চরমে পৌঁছেছে। বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি আনা হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। বরং বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর ফলে কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ যেমন বাড়ছে, তেমনই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সঙ্কট নয়, এর প্রভাব পড়ছে কর্মীদের পরিবারেও। উৎসবের বাজারে সন্তানদের চাহিদা পূরণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা বা শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। অনেকের মতে, সরকারি প্রকল্পে কাজ করেও যদি এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
এই অবস্থায় দ্রুত বকেয়া-সহ পূর্ণ বেতন মিটিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছেন কর্মীরা। পাশাপাশি বকেয়া টিএ অবিলম্বে প্রদান, বেতন কাঠামোর পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যতে সময়মতো পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার দাবিও উঠেছে জোরালোভাবে। সংশ্লিষ্ট দফতরের কাছে বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে ক্ষোভের আবহে এখন আন্দোলনের সুরও শোনা যাচ্ছে। কর্মীদের একাংশ স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটতে বাধ্য হবেন তাঁরা। যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত বিভাগ বা প্রশাসনের তরফে কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। প্রশ্ন উঠছে, যে কর্মীদের কাঁধে ভর করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এগিয়ে চলেছে, তাঁদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে কেন এমন টালবাহানা?
উৎসবের মুখে অর্ধেক বেতন শুধু আর্থিক সংকট নয়, কর্মীদের আত্মসম্মানেও আঘাত হেনেছে বলেই মনে করছেন অনেকেই। এখন দেখার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অসন্তোষকে কতটা গুরুত্ব দেয়। কারণ, এটি কেবল কিছু কর্মীর বেতনের প্রশ্ন নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের ভিত এবং তার সঙ্গে যুক্ত হাজারো পরিবারের সম্মান ও অস্তিত্বের প্রশ্ন।


