অ্যাম্বুলেন্সে থানায় এসে সুদখোর হেনা লস্করের বিরুদ্ধে মামলা করে ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত মুক্তি চৌধুরী, এক নারীর শেষ লড়াইও ব্যর্থ

ঘটনাক্রমের এই অদ্ভুত ও অস্বস্তিকর যোগসূত্র এখন সরাসরি কাঠগড়ায় তুলছে থানার ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ রাজু রঞ্জন দে-কে। ঘটনার উৎস আরও আগে। নাগাটিল্লার বাসিন্দা হেনা লস্করের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এক অমানবিক সুদের কারবার চালানোর। পরিবারের দাবি, অতিরিক্ত সুদের বোঝা, নিয়মিত হুমকি, মানসিক নির্যাতন আর লাগাতার চাপে মুক্তি চৌধুরীর জীবন হয়ে পড়েছিল অসহনীয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ তাঁর শারীরিক অবস্থাকেও দ্রুত অবনতি ঘটায়।

শারীরিক দুরবস্থার মধ্যেও ন্যায় পাওয়ার আখর ধরে তিনি পৌঁছেছিলেন রাঙ্গিরখাড়ি থানায় অ্যাম্বুলেন্সে করে। তাঁর অবস্থার দিকে তাকিয়েও অভিযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা গিয়েছিল বলে অভিযোগ পরিবারের। পরবর্তীতে দুটি পৃথক মামলা নথিভুক্ত হলেও, তদন্তের গতি ও গুরুত্ব নিয়ে থেকেই যায় সন্দেহ। পরিবার জানাচ্ছে, তদন্ত কতদূর এগোচ্ছে এ প্রশ্ন তিনি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত রেখে গিয়েছিলেন থানার তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে। প্রত্যুত্তরে নাকি শুনেছিলেন সেই চেনা বাক্য তদন্ত চলছে। তবে প্রকৃতপক্ষে তদন্তে কোনও কার্যকর অগ্রগতি হয়েছিল কি? অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? নাকি অভিযোগ নথিবদ্ধ করেই দায় সাড়ার চেষ্টা করেছে প্রশাসন? এ প্রশ্নগুলোই এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘুরছে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার স্বচ্ছ প্রশাসন, ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়ে থাকেন। সরকারি মঞ্চ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আপসহীন মনোভাবের কথা শোনা যায় নিয়মিত। কিন্তু রাঙ্গিরখাড়ি থানার সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে এখন সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর প্রশ্ন দানা বাঁধছে, প্রশাসনিক ঘোষণা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এত বিস্তর ফারাক কেন?

মুক্তি চৌধুরীর মৃত্যু এখন আর শুধুমাত্র একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয় এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে রাজ্যের বিচারব্যবস্থা ও পুলিশি দায়বদ্ধতার প্রতি আস্থার প্রশ্নে। একজন অসুস্থ মহিলা যখন নিজেকে অত্যাচারের বলয় থেকে মুক্ত করতে শেষ শক্তিটুকু নিয়েই থানায় উপস্থিত হন, তখন কি তাঁর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা পুলিশের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব নয়?

পরিবারের অভিযোগ, মুক্তি চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ও হুমকির মধ্যে ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি থানায় গিয়ে অভিযোগ জানান। প্রশ্ন উঠছে, তাঁর অভিযোগ কি যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছিল? হুমকি ও মানসিক চাপের বিষয়টি কি গুরুত্ব সহকারে নথিভুক্ত ও তদন্ত করা হয়েছিল? অসুস্থ অবস্থায় থানায় উপস্থিত হওয়া একজন মহিলাকে কি প্রাপ্য মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল? আইনের চোখে থানাই একজন নাগরিকের শেষ আশ্রয়স্থল।

সেখানে যদি অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা নিশ্চিত না হয়, তবে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? মামলা দায়েরের পর তদন্ত বাস্তবিকই কতদূর অগ্রসর হয়েছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কেবল নথিভুক্ত করা আর প্রকৃত তদন্ত চালানো এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মৃত্যুর আগের দিনও মুক্তি চৌধুরী তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। সেই আশঙ্কাকে কি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল? সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে কি কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ উত্তর না মিললে সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও ঘনীভূত হবে।

মুক্তি চৌধুরীর মৃত্যু তাঁর পরিবারকে নিঃসন্দেহে শোকের অতলে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার সামাজিক অভিঘাত আরও বিস্তৃত। এটি এখন একটি বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতীক—একজন সাধারণ নাগরিক কি নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের আশায় থানায় গিয়ে সত্যিই সুরক্ষা পান? রাজ্যের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যখন জিরো টলারেন্স এর কথা বলেন, তখন তার প্রতিফলন তৃণমূল স্তরে দৃশ্যমান হওয়াই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। নচেৎ প্রশাসনিক বার্তা কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবতা বদলায় না।

এই মৃত্যু কোনোভাবেই গৌণ ঘটনা নয়। এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার এক কঠিন পরীক্ষা। প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ তদন্ত যাতে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর স্পষ্টভাবে সামনে আসে। দোষী যেই হোক, আইনের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, এই বার্তাই জনআস্থা পুনর্গঠনের একমাত্র পথ। মুক্তি চৌধুরীর পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায়বিচার শুধু আদালতের রায় নয়, এটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তার নাম।

শোকস্তব্ধ পরিবার ন্যায় বিচার চায়। সমাজও একই প্রশ্ন তুলছে, এই মৃত্যু কি শুধুই ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য? নাকি প্রশাসনের শিথিলতা ও উদাসীনতার প্রত্যক্ষ ফল? রাঙ্গিরখাড়ি থানার ভূমিকা এখন সরাসরি জনতার বিচারের কাঠগড়ায়। এ ঘটনায় নৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনি দায় নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এই এক ঘটনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্ন। মুক্তি চৌধুরী আর ফিরবেন না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর যে প্রশ্নপত্র তিনি রেখে গেছেন, তার উত্তরদায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ প্রশাসনের নেই।

Related Posts

আবার কি ফিরবে ২০২২ এর দুঃস্বপ্ন? সংস্কারহীন বেথুকান্দি ও বেরেঙ্গা বাঁধে আতঙ্কে শিলচরের মানুষ

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃবর্ষা আসতে আর হাতে গোনা কয়েক সপ্তাহ। আকাশে এখনও মেঘ জমেনি, কিন্তু শিলচরের বহু মানুষের মনে ইতিমধ্যেই জমতে শুরু করেছে উদ্বেগের কালো ছায়া। কারণ, শহরের অন্যতম অতি…

হিমন্তের আমলে কাটা পড়েছে ৬৫ হাজার গাছ, এক দশকে সংখ্যা এক লক্ষ ছাড়াল

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ গত এক দশকে অসমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য এক লক্ষেরও বেশি পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটা হয়েছে। তথ্য জানার অধিকার আইনের (আরটিআই) মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের…