ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃবর্ষা আসতে আর হাতে গোনা কয়েক সপ্তাহ। আকাশে এখনও মেঘ জমেনি, কিন্তু শিলচরের বহু মানুষের মনে ইতিমধ্যেই জমতে শুরু করেছে উদ্বেগের কালো ছায়া। কারণ, শহরের অন্যতম অতি ঝুঁকিপূর্ণ দুই বাঁধ বেথুকান্দি ও বেরেঙ্গা–নাথপাড়া সংস্কারের অগ্রগতি এখনও প্রায় অদৃশ্য। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাজা। বহুদিন জলমগ্ন ছিল পুরোনো শিলচর। ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব কিছুই ডুবে গিয়েছিল বন্যার জলে। সেই ট্র্যাজেডির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছিল এই দুই বাঁধের দুর্বলতা।
বহু জায়গায় বাঁধ ভেঙে গিয়ে হুহু করে জল ঢুকে পড়েছিল শহরের অভ্যন্তরে। বন্যার পর রাজ্যের জলসম্পদ দপ্তর একাধিক প্রকল্প ও পরিকল্পনার ঘোষণা করে। শিলান্যাস হয়, বৈঠক হয়, পরিদর্শন হয়। রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী পীযূষ হাজারিকা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, গত কয়েক বছরে শিলচরসহ সমগ্র আসামে প্রায় ১০০০ কিলোমিটার বাঁধ স্বশক্তিকরণ করা হয়েছে, যার জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ২২০০ কোটি টাকা। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, যদি এত কাজ হয়ে থাকে, তবে বেথুকান্দি ও বেরেঙ্গা–নাথপাড়া বাঁধের বর্তমান অবস্থা এমন কেন?
মাঠপর্যায়ে ঘুরে দেখা গেছে, বহু অংশে এখনও দৃশ্যমান নয় পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের চিহ্ন। কোথাও মাটি ফেলা হয়েছে, কোথাও আংশিক মেরামত, কিন্তু সামগ্রিক শক্তিশালীকরণ বা পাথর বসানোর কাজ শেষ হয়নি বলে অভিযোগ। বর্ষার আগে সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, অথচ কাজের গতি শ্লথ। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নেমেছে চারটি সামাজিক সংগঠন ও এলাকার বাসিন্দারা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, বর্ষা শুরু হওয়ার আগে যদি সংস্কার সম্পূর্ণ না হয়, তবে ২০২২ সালের পুনরাবৃত্তি অস্বাভাবিক কিছু হবে না। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রশাসনকে ইতিমধ্যেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজনে বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও শোনা যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পর প্রথম এক দেড় বছর কিছু কাজের গতি দেখা গেলেও পরে তা অনেকটাই থেমে যায়। বরাদ্দ অর্থ, প্রকল্পের বাস্তবায়ন, তদারকি সবকিছু নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। ২০২২ সালের বন্যা শুধু জলবন্দি করেনি শিলচরকে, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করেছিল হাজার হাজার পরিবারকে। বহু মানুষ দীর্ঘদিন আশ্রয়শিবিরে কাটিয়েছেন। ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল। স্কুল-কলেজের পাঠদান থমকে গিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার পর প্রত্যাশা ছিল, এবার অন্তত স্থায়ী সমাধান হবে। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও যদি একই ঝুঁকি রয়ে যায়, তবে মানুষের আস্থা স্বাভাবিকভাবেই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
বিভাগীয় তরফে মাঝে মাঝে অগ্রগতির দাবি শোনা গেলেও স্থানীয়দের মতে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়মিত আপডেটের অভাবেও মানুষের সন্দেহ আরও বাড়ছে। স্থানীয় সচেতন মানুষের অভিযোগ, বাঁধ মজবুত করার ক্ষেত্রে শুধু মাটি ফেলা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা, পাথর ও জিওটেক্সটাইল ব্যবহারের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বর্ষার আগে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন। বর্ষা আসতে আর বেশি দেরি নেই।
প্রকৃতি অপেক্ষা করে না প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য। তাই এখনই দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। শিলচরের মানুষ আর প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব ফলাফল দেখতে চান। তারা চান নিরাপত্তা, স্থায়ী সমাধান এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি।

বরাক উপত্যকার মানুষ প্রতি বর্ষায় যে আতঙ্ক বুকে নিয়ে দিন কাটান, তার কেন্দ্রে বারবার উঠে আসে একটি নাম বেথুকান্দি বাঁধ। কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের ঘোষণা, শিলান্যাসের জাঁকজমক, প্রশাসনিক আশ্বাস সবকিছু মিলিয়ে এক সময় আশার আলো জ্বলেছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র আজ ভিন্ন। জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় প্রায় ৫ কোটি টাকার প্রক্রিয়া আটকে থাকায় বছরের পর বছর ধরে কাজ প্রায় থমকে। আর সেই ফাঁকেই ক্রমশ ভাঙনের মুখে পড়ছে বাঁধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ।
২০২০ ও ২০২২ সালে বেথুকান্দি বাঁধে দুটি বড় প্রকল্পের শিলান্যাস হয়। ১০.৪৭ কোটি টাকার বাঁধ স্বশক্তিকরণ প্রকল্প ৭ কোটি টাকার স্লুইস গেট নির্মাণ প্রকল্প বাঁধের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি প্রায় ৮০ মিটার দীর্ঘ। কোথাও কোথাও বাঁধের প্রস্থ মাত্র দুই থেকে তিন ফুটে নেমে এসেছে। বর্ষায় সামান্য জলের চাপ বাড়লেই এই অংশ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রবল। এই অংশের সংস্কারের জন্য ১.৬৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজের গতি প্রায় চোখে পড়ার মতো নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যে অংশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানেই কাজের অগ্রগতি সবচেয়ে কম। কাগজে-কলমে প্রকল্পের অঙ্ক মোট ১৭ কোটিরও বেশি। কিন্তু বাস্তবে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় প্রায় ৫ কোটি টাকার কাজ আটকে আছে। ফলে প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দূর অস্ত, বরং অগ্রগতি এতটাই ধীর যে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ জমেছে।
গত ১৬ ডিসেম্বর পাঁচ সংগঠনের প্রতিনিধি দল শিলচরে জলসম্পদ দপ্তরের কার্যালয়ে এক পর্যালোচনা বৈঠকে অংশ নেয়। উপস্থিত ছিলেন দপ্তরের এসডিও দেবাশীষ আচার্যী ও বদরুল হক লস্কর। সেদিন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, বেথুকান্দির জমি অধিগ্রহণের ক্যাবিনেট অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন হবে বেরেঙ্গা–নাথপাড়ার ৮০ মিটার ঝুঁকিপূর্ণ অংশের কাজ ৩০–৩৫ দিনের মধ্যেই শেষ করা হবে কিন্তু সেই সময়সীমা বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। বাস্তবে কাজের গতি দেখে হতাশ সংগঠনগুলির প্রতিনিধিরা।
১ মার্চ চার সংগঠনের প্রতিনিধি দল সরেজমিনে বাঁধ পরিদর্শনে যায়। উপস্থিত ছিলেন, ইউনিফাইড ফোরাম ফর বরাক ভ্যালি ডেভেলপমেন্ট, মার্থ ফর সায়েন্স শিলচর চ্যাপ্টার, নাগরিক স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং প্রগতিশীল নাগরিক সমন্বয় মঞ্চের প্রতিনিধিরা। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন বহু স্থানীয় বাসিন্দা। পরিদর্শনে গিয়ে তাঁদের অভিযোগ, কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। অনেক জায়গায় কাজ শুরুই হয়নি। যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক নেই, বরাদ্দ আছে, বাস্তব নেই। এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, বর্ষা এলেই আমাদের রাতের ঘুম উড়ে যায়।
এত টাকা বরাদ্দ হওয়ার পরও যদি এই অবস্থা থাকে, তবে ভরসা রাখব কিসের ওপর? বরাক উপত্যকায় অতীতে একাধিকবার বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমি, ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবকিছু জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ফলে বেথুকান্দি বাঁধের দুর্বলতা শুধুই একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, এটি হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। স্থানীয়দের বক্তব্য, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে আসন্ন বর্ষায় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ৮০ মিটারের সেই সরু অংশটিই এখন পুরো এলাকার জন্য এক টাইম বোমা।
সংগঠনগুলোর কড়া আপত্তির মুখে এসডিও বদরুল হক লস্কর নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেন, ৩১ মার্চের মধ্যেই গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করা হবে, ১০ মার্চ সাইটে ৩৩% কাজের অগ্রগতি দেখানো হবে, ২০ মার্চ দেখানো হবে ৬৬% অগ্রগতি। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয়দের সক্রিয় তদারকি এবং জনপ্রতিনিধিদের যুক্ত উদ্যোগ ছাড়া কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠছে, শিলান্যাসের পরও কেন প্রকল্পের অগ্রগতি এত ধীর? জমি অধিগ্রহণের সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের তৎপরতা কোথায়?
বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে কি? সংগঠনগুলির দাবি, অবিলম্বে কাজের গতি বাড়াতে হবে, নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে এবং অগ্রগতির স্বচ্ছ রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। বর্ষা শুরু হতে আর খুব দেরি নেই। চার বছর আগে যে দুর্যোগের সাক্ষী ছিলো শিলচর, সেটি যেন আবার ফিরে না আসে এই আতঙ্কে দিন গুনছেন এলাকার মানুষ। বাঁধ সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে দপ্তরের এমন উদাসীনতা নিয়ে ক্ষোভ জমছে জনমনে।
সবাই একবাক্যে বলছেন, এইবার কাজের মান ও সময় দুটোই মানতে হবে। নইলে আবারো বন্যার ঝুঁকি তাড়া করবে সমগ্র এলাকা। এখন দেখার বিষয়, দপ্তর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে ৩১ মার্চের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারে কি না। কারণ সময় যতই এগোচ্ছে, বর্ষার আগমনী স্রোত ততই বাড়িয়ে দিচ্ছে মানুষের দুশ্চিন্তা। বর্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী বিপর্যয়ের দায় এড়ানো কঠিন হবে। বেথুকান্দির মানুষ আজ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজ দেখতে চান।


