বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২১ এপ্রিলঃ দেশের কর্পোরেট সংস্কৃতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে ফের নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল এয়ার ইন্ডিয়া। সংস্থার মহিলা কর্মীদের জন্য কথিত এক পোশাকবিধি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, ওই নির্দেশিকায় কর্মীদের সিঁদুর, টিপ, টিকা কিংবা মঙ্গলসূত্রের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যদিও সংস্থার তরফে দাবি করা হয়েছে, এই নির্দেশিকা পুরনো এবং বর্তমানে এমন কোনও বিধিনিষেধ বলবৎ নেই।
ভাইরাল বিজ্ঞপ্তিতে চাঞ্চল্য, নেটিজেনদের প্রশ্ন, পেশাদারিত্বের নামে কি সাংস্কৃতিক দমন?
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, কেবিন ক্রুদের জন্য অত্যন্ত কঠোর পোশাক ও অলংকার সংক্রান্ত নিয়ম জারি করা হয়েছিল। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, কপালে টিপ, টিকা বা সিঁদুর পরা যাবে না, মঙ্গলসূত্র, ধর্মীয় সুতো বা পুঁতির মালা নিষিদ্ধ, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ধরনের সাদা বা সোনার সাধারণ চুড়ি অনুমোদিত, নাকছাবি, পায়ের আঙুলের আংটি, নূপুর, মেহেন্দি বা রঙিন অলংকার পরা যাবে না, কব্জি, গোড়ালি বা বাহুতে ধর্মীয় সুতো বা প্রতীক ব্যবহার নিষিদ্ধ, এই নির্দেশিকাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, একটি সংস্থা কি কর্মীদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয় এতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?
ইউনিফর্মের আড়ালে পরিচয় সংকট? ধর্মীয় প্রতীক নিষিদ্ধের অভিযোগে তোলপাড়, কাঠগড়ায় এয়ার ইন্ডিয়া
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ্যে আসার পরই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বহু ব্যবহারকারী সরাসরি এই নির্দেশিকাকে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ বলে আখ্যা দেন। একজন নেটিজেন লেখেন, অনেক মুসলিম দেশে বিমানসেবিকাদের হিজাব পরার অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে ভারতে কেন ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখতে হবে?
অন্য এক ব্যবহারকারীর মন্তব্য, কর্পোরেট শৃঙ্খলার নামে আমরা কি ধীরে ধীরে নিজেদের সংস্কৃতি বিসর্জন দিচ্ছি? কেউ কেউ আবার অন্যান্য বিমান সংস্থার দিকেও আঙুল তোলেন, যেমন ইন্ডিগো, আকাসা এয়ার এবং স্পাইসজেট তাঁদের পোশাকবিধিও কি একইরকম কঠোর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সিঁদুর-টিপ নিষেধাজ্ঞার অভিযোগে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, পুরনো নির্দেশিকা’ বলে দায় এড়াল সংস্থা
বিতর্ক তুঙ্গে উঠতেই এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়ানো নির্দেশিকাটি পুরনো এবং বর্তমানে এমন কোনও নিয়ম চালু নেই। সংস্থার মুখপাত্র দাবি করেন, আমাদের কর্মীরা তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক ও সাজগোজ করতে পারেন। দেশীয় বা পাশ্চাত্য, সব ধরনের পোশাকের ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা রয়েছে। এই বক্তব্যের পর কিছুটা বিতর্ক স্তিমিত হলেও, প্রশ্ন থেকে যায়, যদি এটি পুরনোও হয়, তবে কেন এমন নির্দেশিকা আদৌ জারি করা হয়েছিল?
লেন্সকার্ট বিতর্কের প্রতিধ্বনি
উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগেও একই ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছিল জনপ্রিয় চশমা সংস্থা লেন্সকার্ট। সেখানেও কর্মীদের টিপ, সিঁদুর, মঙ্গলসূত্র ইত্যাদি পরায় নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ উঠেছিল। তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শেষপর্যন্ত সংস্থাটি তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় এবং জানায়, কর্মীরা তাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বজায় রেখেই কাজ করতে পারবেন। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আরও একবার প্রমাণ করল, কর্পোরেট নীতির সঙ্গে সমাজের সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সংঘাত ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চিহ্নে নিষেধাজ্ঞার অভিযোগে নেটিজেনদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, কর্পোরেট সংস্থাগুলি ‘ইউনিফর্মিটি’ বজায় রাখার নামে অনেক সময় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে খর্ব করে ফেলছে। বিমান পরিষেবার মতো ক্ষেত্রগুলিতে নির্দিষ্ট ড্রেস কোড থাকা স্বাভাবিক হলেও, তা যদি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
অন্যদিকে, কর্পোরেট মহলের একটি অংশের যুক্তি, ব্র্যান্ড ইমেজ ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রয়োজন। তবে সেই মানদণ্ড কতটা ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, সেটাই এখন মূল বিতর্কের বিষয়।
ইউনিফর্মের আড়ালে পরিচয় সংকট?
এই ধরনের বিতর্ক বারবার সামনে আসায় স্পষ্ট, কেবল নিয়ম জারি করলেই হবে না, সেই নিয়মের পেছনে থাকা দর্শন ও উদ্দেশ্যও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে। কর্মীদের অনুভূতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান জানিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি তৈরিই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ।
এয়ার ইন্ডিয়ার এই বিতর্ক হয়তো সাময়িক, কিন্তু যে প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে, তা দীর্ঘমেয়াদী। কর্পোরেট শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার এই টানাপোড়েন আগামী দিনে আরও তীব্র হতে পারে। এখন দেখার, সংস্থাগুলি কতটা সংবেদনশীলতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।


