ইরান হামলার পর ক্ষোভে ফুঁসছে উপসাগরীয় দেশগুলি, মার্কিন সেনাঘাঁটি বন্ধের দাবি, আমেরিকার বিরুদ্ধে সরব আমিরশাহী

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের উপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ। সেই হামলার পর মুহূর্তেই জ্বলে ওঠে যুদ্ধের আগুন, যার অভিঘাতে নাজেহাল হয়ে পড়ে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চল। বিশেষ করে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং বাহরিনের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, এই দেশগুলিতে আমেরিকার শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন তারা সুরক্ষিত থাকল না? বহু বছর ধরে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক সেনাঘাঁটি স্থাপন করেছে আমেরিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলায় সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই আমেরিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরশাহী। কড়া ভাষায় ওয়াশিংটনের সমালোচনা করে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল খালেক আবদুল্লা সরাসরি দাবি তুলেছেন, দেশে থাকা সমস্ত মার্কিন সেনাঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়া হোক। তাঁর এই মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের একাংশের জমে থাকা ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই প্রেক্ষাপটেই আবদুল খালেক আবদুল্লার বিস্ফোরক মন্তব্য, আমাদের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, ইরানের হামলার সময় স্পষ্ট হয়েছে যে, আমিরশাহী নিজেই নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম। ফলে বিদেশি শক্তির উপর নির্ভর না করে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলি এখন আর সম্পদ নয়, বরং বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে আরও গভীর অসন্তোষ। উপসাগরীয় দেশগুলির অভিযোগ, ইরানে হামলার আগে তাদের কোনও পূর্বাভাস দেয়নি ওয়াশিংটন। ফলে আকস্মিক প্রতিশোধমূলক হামলার জন্য তারা প্রস্তুত থাকার সুযোগ পায়নি। সেই সুযোগেই ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার জেরে প্রাণহানি থেকে শুরু করে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় এই দেশগুলিকে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব কি ধীরে ধীরে ক্ষয় হচ্ছে? বহু বছর ধরে এই অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই প্রভাবের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলেই মত আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের। একই সঙ্গে, ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ক্ষমতা ও কৌশলগত পদক্ষেপও নতুন করে সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলির মধ্যে আস্থার সংকট এই দ্বৈত চাপে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। কূটনৈতিক সমাধানের পথ যত সংকীর্ণ হচ্ছে, ততই বাড়ছে সংঘাতের সম্ভাবনা। বিশ্বরাজনীতি এখন তাকিয়ে এই আগুন কি দ্রুত নেভানো যাবে, নাকি তা আরও বড় অগ্নিকাণ্ডের রূপ নেবে?

Related Posts

হরমুজ ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা: ট্রাম্প-মুনির ফোনালাপে উঠে এল অবরোধের প্রভাব, শান্তি আলোচনায় ‘অযৌক্তিক শর্ত’ অভিযোগে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তেহরান, বাড়ছে যুদ্ধের আশঙ্কা

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২১ এপ্রিলঃ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনিয়ে উঠেছে। নির্ধারিত বৈঠকের ঠিক আগে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াল Iran, আর তাতেই কার্যত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে গেল…

হরমুজ খুলে ট্রাম্পের কূটনৈতিক চাল, চিনকে কাছে টানার বার্তা, বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ?

বরাকবাণী ডিজিটাল ১৭ এপ্রিলঃ বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে এক চমকপ্রদ চাল চাললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বহুদিনের উত্তেজনা, সামরিক সংঘাত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার পর তিনি ঘোষণা করলেন, হরমুজ প্রণালী আবার…