ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ গত এক দশকে অসমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য এক লক্ষেরও বেশি পূর্ণবয়স্ক গাছ কাটা হয়েছে। তথ্য জানার অধিকার আইনের (আরটিআই) মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মে মাস থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত রাজ্যে মোট ১,০৬,৮৯৬টি পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার শাসনামলেই কাটা হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার গাছ। আরটিআইয়ের মাধ্যমে এই তথ্য চাওয়া হয়েছিল রাজ্যের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন দফতরের অধীন প্রধান মুখ্য বন সংরক্ষক (পিসিসিএফ) ও বনবাহিনীর প্রধানের কার্যালয় থেকে।
আবেদনটি রাজ্যের ৪৪টি বন্যপ্রাণী ও আঞ্চলিক বন বিভাগের কাছে পাঠানো হয়। এর মধ্যে মাত্র ১৫টি বিভাগ গাছ কাটার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছে। আরও ১২টি বিভাগ জবাব দিলেও গাছ কাটার বিষয়ে কোনও তথ্য দেয়নি এবং বাকি ১৬টি বিভাগ এখনও পর্যন্ত কোনও উত্তর দেয়নি। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই পরিবেশবিদ ও গবেষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক গাছ কাটার ফলে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় পরিসরে গাছ কাটার আগে বা পরে কোনও পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা হয়নি, যা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আরটিআইয়ের জবাব দেওয়া মোট ২৭টি বিভাগের কেউই এত বড় সংখ্যক গাছ কাটার ফলে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়েছে, তা নিয়ে কোনও সমীক্ষা পরিচালনা করেনি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর থেকে কাটা পড়া মোট গাছের মধ্যে প্রায় ২৬ হাজারটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ছিল, আর বাকিগুলি ছিল বনাঞ্চলের বাইরে বিভিন্ন স্থানে। তথ্যে দেখা গেছে, মোট গাছের মধ্যে প্রায় ৮৪ হাজার গাছ কাটা হয়েছে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য।
এর মধ্যে রয়েছে রাস্তা, সেতু, ফ্লাইওভার, কারখানা নির্মাণ, মেডিক্যাল কলেজ, পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প সহ বিভিন্ন পরিকাঠামোগত প্রকল্প। অন্যদিকে, ১০ হাজারেরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে বেসরকারি প্রকল্পের জন্য। আরটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাছ কাটার হার আরও বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়কাল অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। এর আগে সর্বানন্দ সোনোয়াল সরকারের সময়ে কাটা পড়েছিল ১৮ হাজারের বেশি গাছ।
এই প্রসঙ্গে রাজ্যের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারি জানান, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের ‘অত্যাবশ্যক প্রয়োজনের’ কারণেই গাছগুলি কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিকাঠামো উন্নয়ন, তেল অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। মন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, গুয়াহাটি থেকে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত জাতীয় সড়ক–১৭ চার লেনে উন্নীত করার কাজ, দরং মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ, এবং তেল সংস্থা ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়ার বিভিন্ন অনুসন্ধানমূলক প্রকল্পের জন্য বিপুল সংখ্যক গাছ কাটতে হয়েছে।
দরং মেডিক্যাল কলেজের জন্য যে জমি ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে আগে রেশম চাষের বাগান ছিল এবং নির্মাণকাজের জন্য পুরো এলাকাটি পরিষ্কার করতে হয়েছে। সবুজ আচ্ছাদন কমে যাওয়ার অভিযোগের জবাবে মন্ত্রী জানান, ক্ষতিপূরণ হিসেবে রাজ্য সরকার ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় রাজ্যে মোট সাড়ে তিন কোটি চারা গাছ রোপণ করা হয়েছে।
অমৃত বৃক্ষ আন্দোলন’ কর্মসূচির আওতায় একদিনেই এক কোটি চারা রোপণের নজিরও গড়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বন বিভাগের রিপোর্ট অনুযায়ী, যথাযথ পরিচর্যার ফলে রোপণ করা চারাগাছের মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি টিকে আছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে পরিবেশবিদরা মনে করছেন, পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে ফেলার সঙ্গে চারা গাছ লাগানোর তুলনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
কটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ জীববিজ্ঞান ও বন্যপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নারায়ণ শর্মা বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বহু দশকের পরিবেশগত মূল্য বহন করে, যা অল্প সময়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ কার্বন সঞ্চয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি আরও বলেন, কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় বিপুল সংখ্যক গাছ কাটা হলে সেখানে অবশ্যই পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা করা উচিত। এই ধরনের গবেষণা স্থানীয় জলবায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব নির্ধারণে সহায়তা করে।
একই মত প্রকাশ করেছেন গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মিনাক্ষী বরা। তিনি বলেন, এক লক্ষের বেশি পূর্ণবয়স্ক গাছ কেটে ফেলা এবং তার পরিবর্তে চারা গাছ লাগানো এই দুটি বিষয় পরিবেশগতভাবে সমান নয়। তাঁর মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বহু বছরের জৈবভর, কার্বন সঞ্চয় এবং প্রাণীকুলের আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে, যা একটি চারা গাছ তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারে না।
মিনাক্ষী বরা সতর্ক করে বলেন, যথাযথ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া এভাবে গাছ কাটতে থাকলে ধীরে ধীরে পরিবেশগত অবক্ষয় ঘটতে পারে, যার প্রভাব একসময় গুরুতর এবং অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও সমীক্ষা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে রাজ্যের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের উপর তার গভীর প্রভাব পড়তে পারে।


