বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২১ এপ্রিলঃ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তার ছায়া ঘনিয়ে উঠেছে। নির্ধারিত বৈঠকের ঠিক আগে শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াল Iran, আর তাতেই কার্যত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢেকে গেল আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সংলাপের পথ। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তাও এখন প্রশ্নের মুখে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ওয়াশিংটন-ইসলামাবাদ যোগাযোগ।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স সূত্রে জানা যাচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ হয়েছে। এই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী যেখানে সাম্প্রতিক উত্তেজনা গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্রের দাবি, ফোনালাপে মুনির সরাসরি তুলে ধরেন হরমুজ প্রণালী অবরোধের বহুমুখী প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর তার সম্ভাব্য অভিঘাতও। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরান-আমেরিকা সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষত তেল পরিবহণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর জবাবে ট্রাম্প জানান, এই পরামর্শ তিনি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন যদিও তাৎক্ষণিক কোনও নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি।
এদিকে, সোমবার ভোরেই ইরানের জাতীয় গণমাধ্যম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার শান্তি বৈঠক নিয়ে যে জল্পনা ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তেহরানের অভিযোগ, শান্তি আলোচনার নামে ওয়াশিংটন একের পর এক “অযৌক্তিক” ও “অবাস্তব” শর্ত চাপিয়ে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, আলোচনা চলাকালীন নিজেদের অবস্থান বারবার পরিবর্তন করছে আমেরিকা যা কূটনৈতিক আস্থার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী আবারও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। যুদ্ধ চলাকালীন এই জলপথ বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান, পরে সংঘর্ষবিরতির শর্ত মেনে তা খুলে দেয়। কিন্তু তেহরানের অভিযোগ, সেই সুযোগে আমেরিকাই কার্যত পাল্টা অবরোধ আরোপ করে ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলিকে নিশানা করার হুঁশিয়ারি দিয়ে। ইরানের মতে, এই পদক্ষেপ সরাসরি সংঘর্ষবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন এবং তা শান্তি প্রক্রিয়াকে ভেস্তে দেওয়ার সামিল।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই অচলাবস্থার মূলেই রয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আগ্রাসী কূটনৈতিক অবস্থান। অনেকেই মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কড়া নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধবিরতির পরেও স্থায়ী শান্তির পথ ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। ইসলামাবাদ কি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাইছে? আসিম মুনিরের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে মত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একাংশের। তবে বাস্তবে এই উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একদিকে ভেঙে পড়া সংলাপের সম্ভাবনা, অন্যদিকে কৌশলগত জলপথে উত্তেজনা এই দ্বৈত সংকট মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্বরাজনীতি এখন তাকিয়ে আছে কূটনীতি কি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগুন নেভাতে পারবে, নাকি নতুন করে জ্বলবে সংঘর্ষের শিখা?


