বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১৮ এপ্রিলঃ মাত্র পাঁচ-ছয় মাস আগেই যে ছয় নম্বর জাতীয় সড়ককে ঘিরে ছিল উন্নয়নের ঢাকঢোল, ফিতা কাটা আর বড় বড় আশ্বাস আজ সেই রাস্তাই যেন এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময়ের চকচকে পিচঢালা পথ এখন পরিণত হয়েছে কঙ্কালসার, ভাঙাচোরা এবং ধুলায় আচ্ছন্ন এক দুর্বিষহ যন্ত্রণার নাম।
সড়কের বিভিন্ন অংশে দেখা যাচ্ছে বড় বড় গর্ত, কোথাও উঠে গেছে পিচের আস্তরণ, আবার কোথাও ধুলোর ঝড়ে পথচলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করা সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যানবাহন চালকরা পড়ছেন চরম দুর্ভোগে। স্থানীয়দের মতে, এটি আর সড়ক নয়, বরং অবহেলা আর অনিয়মের এক দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতীক।
অভিযোগ উঠেছে, নির্মাণকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। বর্ষা আসার আগেই সড়কের এমন বেহাল দশা সেই অভিযোগকেই আরও জোরালো করছে। উন্নয়নের নামে জনসাধারণের অর্থ কীভাবে অপচয় হচ্ছে, এই সড়ক তারই এক প্রকট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিস্থিতির পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা এখনও পর্যন্ত সামনে এসে কোনো রকম জবাবদিহি করেনি।
ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই স্পষ্ট দাবি, অবিলম্বে সড়কের কাজ শুরু করতে হবে, নিম্নমানের নির্মাণের জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যেন শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তবেও তার প্রতিফলন দেখতে চান সাধারণ মানুষ।
ধুলায় দমবন্ধ জনজীবন, ধুলো-গর্তে বিপন্ন জনজীবন, রাজনীতির খেলায় বলি রাস্তা
ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের ভাঙাচোরা চেহারা শুধু যাতায়াতের দুর্ভোগই বাড়াচ্ছে না, বরং ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্যের উপর নেমে আনছে এক নীরব বিপর্যয়। সড়কের ধুলাবালি এখন এলাকাবাসীর প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর সেই ধুলোর বিষেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা মানেই ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে হেঁটে বা চলাচল করা।
শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, চোখে জ্বালা, কাশি এমন নানা উপসর্গে ভুগছেন বহু মানুষ। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাও বাড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এক স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানেই ধুলো গিলতে হয়। মনে হয় যেন প্রতিদিন নিজের শরীরকে একটু একটু করে বিষ দিচ্ছি। এই একটিমাত্র মন্তব্যই বর্তমান পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে দেয়।
প্রশ্ন উঠছে, এই দিনের জন্যই কি মানুষ কর দেয়? জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক যদি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়, তবে উন্নয়নের দাবির ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়? এলাকাবাসীর ক্ষোভ আরও বেড়েছে এই কারণে যে, এত বড় সমস্যা সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর কিংবা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।
ফলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, এই অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার দায় শেষ পর্যন্ত নেবে কে? স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করার পাশাপাশি ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, নিম্নমানের নির্মাণ ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, এই সড়ক শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও এক মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে।
পাঁচ মাসেই রাস্তার কঙ্কালসার চেহারা নীরব প্রশাসন, দায় এড়াতে ব্যস্ত শাসক-বিরোধী সবাই
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করে বলেন,শুধু প্রশাসনের গাফিলতি নয়, এই ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদাসীনতাও। শাসক দলের নেতারা উন্নয়নের প্রচারে ব্যস্ত থাকলেও বাস্তব সমস্যার দিকে তাদের নজর নেই। অন্যদিকে, বিরোধী দলও এই ইস্যুকে কেবল রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা জনস্বার্থে আন্দোলনের দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়ছে না।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ করে বলেন, ভোটের সময় সবাই আসে, প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হলে কেউ আর ফিরে তাকায় না। এই ক্ষোভ এখন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে জনরোষে। আরও আশঙ্কার বিষয়, এই ভাঙাচোরা রাস্তা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ইতিমধ্যেই ছোটখাটো দুর্ঘটনার খবর মিলছে। যদি ভবিষ্যতে কোনো প্রাণহানি ঘটে, তার দায়ভার কি প্রশাসন নেবে? নাকি আবারও দায় এড়ানোর খেলায় মেতে উঠবে সংশ্লিষ্টরা?
ছয় নম্বর জাতীয় সড়কের বেহাল দশা ঘিরে ক্ষোভ ক্রমেই বিস্ফোরণের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিদিনের দুর্ভোগ, ধুলাবালিতে অসুস্থতা এবং যাতায়াতের অসহনীয় পরিস্থিতি আর সহ্য করতে রাজি নন সাধারণ মানুষ। এই অবস্থায় এলাকাবাসী একযোগে তুলেছেন জোরাল দাবি, অবিলম্বে সড়কের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নির্মাণকাজের গুণমানের নিরপেক্ষ যাচাই।
জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকায় নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়ক যদি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের বড় বড় দাবিগুলো কতটা বাস্তব সেই প্রশ্ন আজ সরব জনতার মুখে মুখে। একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। সড়কের ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে জল ছিটানো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।
কারণ, প্রতিদিন এই ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেই আক্রান্ত হচ্ছেন নানা শারীরিক সমস্যায়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, উন্নয়নের নামে এই প্রহসন আর কতদিন চলবে? সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে এই নির্মম খেলা বন্ধ হওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রশাসন যদি এখনও নীরব থাকে, তবে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে উঠবে, এটাই স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন এলাকাবাসী। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, এই ক্ষোভ যে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


