সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ব্যবহারের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনে ৭০০ বিশিষ্ট নাগরিকের চিঠি; আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চাপে কেন্দ্র সরকার
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২১ এপ্রিলঃ মহিলা সংরক্ষণ বিল ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপের আবহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ভাষণকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম ব্যবহার করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার চালানোর অভিযোগে এবার সরব শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজও। ঘটনাপ্রবাহ এমন এক মোড় নিয়েছে, যা একদিকে নির্বাচনী নীতিনৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার উপরও বাড়াচ্ছে চাপ।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৮ এপ্রিলের রাত। লোকসভায় আসন সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল খারিজ হয়ে যাওয়ার পরপরই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেই ভাষণ সম্প্রচারিত হয় দূরদর্শন এবং আকাশবাণীতে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত মাধ্যমগুলিতে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই মঞ্চকে ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রী কার্যত নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন এবং বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ শানিয়েছেন।
প্রথমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, সর্ব ভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস এবং Communist Party of India (Marxist)-সহ একাধিক বিরোধী দল এই ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়। তাদের অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সরকারি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন, যা সরাসরি নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের শামিল।
এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে দেশের প্রায় ৭০০ জন বিশিষ্ট নাগরিকের যৌথ অভিযোগপত্র। প্রাক্তন আমলা, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা স্বাক্ষরিত এই চিঠি জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচার মাধ্যমের ব্যবহার কোনোভাবেই দলীয় প্রচারের হাতিয়ার হতে পারে না। এতে সরকারি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ হয়।
রবিবার এই ইস্যুতে সরব হন দুই বাম দলের প্রতিনিধিরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার Gyanesh Kumar-এর কাছে পাঠানো চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর থাকা অবস্থায় এই ধরনের ভাষণ শুধুমাত্র অনৈতিকই নয়, বরং স্পষ্টভাবে নিয়মভঙ্গ। একই সুরে অভিযোগ তোলেন কংগ্রেস সভাপতি Mallikarjun Kharge। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রীর আধ ঘণ্টার ভাষণে ৫৯ বার কংগ্রেসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা ভাষণের উদ্দেশ্য ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
এদিকে রাজনৈতিক ময়দানেও এই ইস্যুতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee হুগলির তারকেশ্বরে এক জনসভা থেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ শানিয়ে এই ঘটনাকে “রাষ্ট্রযন্ত্রের নগ্ন অপব্যবহার” বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী সরকারি ক্ষমতা ও প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে দলীয় স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছেন, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।
সমগ্র ঘটনাপ্রবাহে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে আসছে, তা হলো, সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা ও সীমারেখা কী? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই ধরনের প্ল্যাটফর্মের মূল দায়িত্ব নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক সম্প্রচার। কিন্তু যদি সেই মঞ্চ রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা যায় যে রাষ্ট্র ও শাসকদল একাকার হয়ে যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি ভাষণকে কেন্দ্র করে নয়, বরং এটি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উস্কে দিয়েছে। এখন নজর নির্বাচন কমিশনের দিকে এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী ধরনের নির্দেশিকা জারি করে।
রাজনৈতিক তরজা যতই তীব্র হোক, এই ঘটনায় স্পষ্ট, গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি ও নির্বাচনী আচরণবিধির প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই পরীক্ষায় কে কতটা উত্তীর্ণ হয়, সেটাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ।


