ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ হাইলাকান্দি জেলার কাটাখাল নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শক্তিশালী এক বালু সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে নদীর বুক চিরে নির্বিঘ্নে বালু তুলছে। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে নড়েচড়ে বসে বন বিভাগ। কিন্তু তদন্তে গিয়েই দারালো অস্ত্রের মুখে হেনস্তার শিকার হতে হয় বন বিভাগের কর্মকর্তাদের।
ফলে পুরো ঘটনাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। সূত্রে জানা গেছে, বরাক উপত্যকার একটি দৈনিক পত্রিকায় কয়েকদিন ধরে কাটাখাল নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর শনিবার দুপুরে তদন্তে নামেন হাইলাকান্দি জেলার বন বিভাগের কাটাখাল বিটের কর্মকর্তারা। বিট অফিসার ফখরুল ইসলাম বড়ভুঁইয়া, স্বপন কুমার রায়সহ কয়েকজন বনকর্মী কাটাখাল নদীর বর্ণীমুখ এলাকার ৫১৩ নম্বর কবিগুরু এলপি স্কুলের নিকট অবস্থিত একটি বালু উত্তোলন ঘাটে হানা দেন।

তদন্তের স্বার্থে বনকর্মীরা ঘটনাস্থলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে শুরু করেন। কিন্তু অভিযোগ, ঠিক সেই সময়ই বদর উদ্দিন লস্করের পুত্র মামন লস্করসহ কয়েকজন ব্যক্তি সেখানে এসে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘিরে ধরে। তাদের হাতে ছিল দারালো অস্ত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বন বিভাগের কর্মীদের মোবাইল ফোন থেকে তোলা ভিডিও ও ফটোগুলো জোরপূর্বক মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয়। ঘটনার পর বন বিভাগের কাটাখাল বিট অফিসার ফখরুল ইসলাম বড়ভুঁইয়া কাটাখাল পুলিশ ফাঁড়িতে একটি এজাহার দায়ের করেন।
তবে অভিযোগ দায়েরের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, কাটাখাল নদীতে বহুদিন ধরেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। প্রকাশ্যে দিনের আলোতেই ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে বালু তোলা হয় এবং তা বিভিন্ন জায়গায় পাচার করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের চোখের সামনে এমন কার্যকলাপ চললেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

উল্লেখ্য, গত ২৭ জানুয়ারিও বদর উদ্দিন লস্করসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এরপরও বন বিভাগ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এক অবসরপ্রাপ্ত বন বিভাগের বিট অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পরিবেশ ও নদী রক্ষার স্বার্থে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, নদীভাঙন এলাকা থেকে কমপক্ষে ৫০০ মিটার দূরে বালু ঘাট স্থাপন করতে হয়। একইভাবে স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মন্দির বা সেতুর কাছ থেকেও অন্তত ৫০০ মিটার দূরে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া যায়। কিন্তু কাটাখাল নদীর যেসব স্থানে বর্তমানে বালু উত্তোলন চলছে, সেগুলোর অধিকাংশই এই নিয়মের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট ঘাটটির এক পাশে রয়েছে ৫১৩ নম্বর কবিগুরু এলপি স্কুল এবং অন্য পাশে রয়েছে ৬৪৭ নম্বর বর্ণীরপার এলপি স্কুল। পাশাপাশি রয়েছে বড় একটি ডোবা এবং এলাকায় নতুন করে নদীভাঙনের লক্ষণও দেখা দিয়েছে।

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, এতসব নিয়ম লঙ্ঘন করে কীভাবে সেখানে বালু উত্তোলনের ঘাট চালু রয়েছে? কার আশীর্বাদে এত বড় সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তুলে যাচ্ছে? স্থানীয়দের মতে, কাটাখাল নদীর অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ না থাকলে এতদিন ধরে এভাবে সিন্ডিকেট রাজ চলা সম্ভব নয়।
তারা আরও অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির মদতেই এই অবৈধ ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে। অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর প্রকাশ্যে হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, যদি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদেরই এমন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? এখন এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
একইসঙ্গে কাটাখাল নদীতে চলমান অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিবেশ ও নদী রক্ষায় প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে কাটাখাল নদীর বুক চিরে চলতে থাকা এই অবৈধ বালু সিন্ডিকেট ভবিষ্যতে শুধু পরিবেশই নয়, পুরো এলাকার জনজীবনকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে,এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে।


