ড. নিখিল দাশ শিলচর ৯ মার্চঃ আসন্ন আসাম বিধানসভা নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্ক ও অসন্তোষের সুর ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠছে। শাসকদল বিজেপির অন্দরে নীরবে জমতে শুরু করেছে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। অভিযোগ উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে দলের সংগঠনকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানো একনিষ্ঠ পুরনো কর্মী ও প্রবীণ নেতারা আজ দলীয় রাজনীতিতে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছেন। ফলে বিজেপির ভেতরেই নতুন ও পুরনো নেতৃত্বের মধ্যে এক অদৃশ্য দ্বন্দ্বের আবহ তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে কর্মী মহলে বাড়ছে ক্ষোভ, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
একনিষ্ঠ কর্মী ও সমর্থকদের অভিযোগ, এক সময় আসামের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠন গড়ে তুলতে বিজেপিকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তখন দলকে শক্ত ভিত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে যেসব নেতাকর্মী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই নিজেদের দলেই উপেক্ষিত বলে মনে করছেন। অভিযোগ, দল সম্প্রসারণ ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির লক্ষ্যে এখন নতুন মুখ ও নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হচ্ছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় অনেক প্রবীণ নেতা ও কর্মী ধীরে ধীরে কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন।

দলীয় অন্দরের একাংশের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, দায়িত্ব বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণকে ঘিরে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে কর্মী মহলে নীরব অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন এবং নেতৃত্বের পুনর্বিন্যাস নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, এই পরিস্থিতি দলের ভিতরে অস্বস্তির আবহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
দলের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, যেকোনো বড় রাজনৈতিক দলে সময়ের সঙ্গে নেতৃত্বে পরিবর্তন আসা স্বাভাবিক। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনার মধ্য দিয়ে সংগঠনকে আরও গতিশীল করা যায়। তবে সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় যদি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নেতাদের যথাযথ মর্যাদা না দেওয়া হয়, তাহলে তা সংগঠনের ভেতরে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে। বর্তমানে বিজেপির অন্দরে যে আলোচনা ও বিতর্ক দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে এই মনস্তাত্ত্বিক কারণটিও বড় ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
এদিকে সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও এই পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকের মতে, যাঁরা বছরের পর বছর দলীয় পতাকা হাতে নিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন, তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও গুরুত্ব বজায় রাখা দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দলের একাংশের মত, সময়ের প্রয়োজনেই নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে এবং তা সংগঠনের স্বার্থেই করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিজেপির অন্দরে যে নতুন-পুরনো দ্বন্দ্বের আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এখন রাজনৈতিক মহলে অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই এই অভ্যন্তরীণ সমীকরণ রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিচ্ছে। পুরাতন কর্মীরা আরও অভিযোগ করে বলেন, একসময় কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও যারা বিজেপির পতাকা হাতে নিয়ে সংগঠনকে গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, সেই পুরনো কর্মীদেরই আজ সুপরিকল্পিতভাবে সাইডলাইন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করা নেতাদের টিকিট থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, অথবা তাঁদের সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
রাজ্যের প্রবীণ বিজেপি নেতা ও বিধায়কদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনার নজির সামনে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রবীণ নেতা পরিমল শুক্লবৈদ্যের মতো একাধিক অভিজ্ঞ নেতাকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক সমীকরণের কথা দলীয় মহলে আলোচনায় উঠে এসেছে। একইভাবে দীর্ঘদিনের সংগঠক ও প্রবীণ নেতা যোগেন মোহনকে রাজ্যসভায় পাঠানোর ঘটনাকেও অনেকেই অন্য দৃষ্টিতে দেখছেন। সমালোচকদের মতে, তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে কার্যত রাজ্যের সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে বিজেপির অন্দরে এখন পুরনো কর্মী হঠাও অভিযানের অভিযোগ উঠেছে। কর্মী মহলের দাবি, কাউকে সংসদে পাঠিয়ে, কাউকে টিকিট থেকে বঞ্চিত করে কিংবা কাউকে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে রাজ্য রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ আরও গুরুতর। অনেকের মতে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল বিশেষ করে কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দল থেকে আসা নেতাদের বিজেপিতে এনে দ্রুত তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলার জন্যই এই পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
ফলে যারা বহু বছর ধরে দলের জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে এবং নতুনভাবে যোগদান করা নেতারাই অধিক সুযোগ পাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে বিজেপির একনিষ্ঠ কর্মীদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ। বহু কর্মী মনে করছেন, দলীয় কাঠামোর ভিতরে তারা আর আগের মতো মর্যাদা পাচ্ছেন না। ফলে দলীয় অন্দরে নীরব ক্ষোভ জমতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভ যদি সময়মতো প্রশমিত না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বড় রাজনৈতিক সমস্যার রূপ নিতে পারে।
ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রবীণ নেতা দল ত্যাগ করে অন্য দলে যোগ দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে টিকিট বণ্টনের ক্ষেত্রে পুরনো নেতাদের উপেক্ষা করা হয়, তবে আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতা দল ছাড়ার পথে হাঁটতে পারেন। এই সম্ভাবনাই এখন বিজেপির অন্দরে অস্বস্তির অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। বিজেপি দলের অনুগত সমর্থকদের অভিযোগ, বিজেপি আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তার পেছনে বহু বছরের সংগঠন গড়ে তোলার ইতিহাস রয়েছে।
সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন অসংখ্য পুরনো কর্মী ও নেতা। তাঁদের উপেক্ষা করা হলে তা শুধু দলীয় ঐতিহ্যকেই ক্ষুণ্ণ করবে না, ভবিষ্যতে সাংগঠনিক শক্তিকেও দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে দলের একাংশের যুক্তি, সময়ের সঙ্গে রাজনীতির কৌশলও বদলায়। নতুন নেতৃত্ব ও নতুন মুখকে সামনে আনার মধ্য দিয়েই দলকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। কিন্তু সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ ও সম্মানজনক না হয়, তবে তা দলের ভিতরে বিভাজনের জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্ন এখন একটাই, নতুন বিজেপির উত্থানের পথে কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে পুরনো বিজেপির অস্তিত্ব? নাকি অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়ের মাধ্যমে দল এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে? আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনই হয়তো এই প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর দেবে। তবে বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তাতে বিজেপির অন্দরে নতুন-পুরনো দ্বন্দ্ব যে এক বড় রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই।


