এবিভিপি-এনএসইউআই দ্বন্দ্বে থমথমে ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণ, পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের হস্তক্ষেপ, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি সুশীল সমাজের
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ সুদীর্ঘ ইতিহাস ও শিক্ষার পরিবেশের জন্য পরিচিত শিলচরের ঐতিহ্যবাহী কাছাড় কলেজ মঙ্গলবার কার্যত এক রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ক্যাম্পাসের ভেতরে হিজাব পরাকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ’ (এবিভিপি) এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ (এনএসইউআই)-এর সদস্যদের মধ্যে সংঘটিত হলো এক রক্তক্ষয়ী ও নজিরবিহীন সংঘর্ষ। তুচ্ছ বিরোধ ও বাকবিতণ্ডা থেকে শুরু হওয়া এই মারামারিতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবারের এই ঘটনার আকস্মিকতায় গোটা কলেজ চত্বরে চরম আতঙ্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পরপরই সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে কলেজের সাধারণ পঠনপাঠন ও প্রশাসনিক কাজকর্ম। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে কাছাড় কলেজ প্রাঙ্গণে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এনএসইউআই-এর এক সদস্যপদ সংগ্রহ অভিযান চলছিল। সেখানে সংগঠনের সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সাধারণ ছাত্রীও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে, এনএসইউআই-এর কর্মসূচিতে কয়েকজন ছাত্রী হিজাব পরিহিত অবস্থায় অংশ নেওয়ায় সেখানে উপস্থিত এবিভিপি-র সদস্যরা তাতে তীব্র আপত্তি জানান। এই নিয়ে প্রথমে দুই দলের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই তর্কাতর্কি হাতাহাতি ও চরম হিংসাত্মক রূপ নেয়। এনএসইউআই-এর অভিযোগ, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতেই এবিভিপি-র সদস্যরা সংগঠিত হয়ে আক্রমণ চালান, সদস্য সংগ্রহের জন্য রাখা টেবিল-চেয়ার ভাঙচুর করেন এবং উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের ওপর চড়াও হন।
সংঘর্ষের সময় সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি উঠেছে নারী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, হিজাব পরিহিত কয়েকজন ছাত্রীকেও সেখানে অমানবিক শারীরিক হেনস্থা ও মারধর করা হয়। মারামারির সময় লাঠি ও ঘুসি চালনার ফলে এনএসইউআই-এর একাধিক সদস্য রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। সংঘর্ষের খবর পেয়ে শিলচর সদর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী দ্রুত কাছাড় কলেজে এসে হাজির হয়। তারা ক্যাম্পাসে পৌঁছে লাঠি উঁচিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রগোষ্ঠীকে ছত্রভঙ্গ করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ঘটনার পরপরই আহত ছাত্রছাত্রীদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। যদিও পুলিশের হস্তক্ষেপে বর্তমানে কলেজ চত্বরে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটছে না, তবুও গোটা ক্যাম্পাসজুড়ে এক থমথমে ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে কলেজ প্রাঙ্গণে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে এক দিন আগের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে গভীর চক্রান্তের গন্ধ পাচ্ছেন সচেতন মহল। উল্লেখ্য, মঙ্গলবারের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঠিক এক দিন আগে, অর্থাৎ সোমবার কাছাড় কলেজের ছাত্রদের একাংশ কাছাড়ের জেলা শাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছিলেন। সেই স্মারকলিপিতে তাঁরা কলেজের ভেতরে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় পোশাক হিসেবে ‘হিজাব’ এবং ‘টুপি’ পরা নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।
সোমবারে জেলা শাসকের কাছে দেওয়া সেই স্মারকলিপির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মঙ্গলবার হিজাব কেন্দ্রিক বিরোধ ও হামলার ঘটনা ঘটায় অনেকেই মনে করছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় পোশাকের মুদ্দা তুলে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের পোশাক সংক্রান্ত বিরোধ কীভাবে এমন হিংসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছায়, তা নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
উঠে আসা কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন, সোমবার জেলা শাসকের কাছে হিজাব নিষেধাজ্ঞার দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়ার পর কলেজে যে উত্তেজনা ছড়াতে পারে, সে ব্যাপারে কলেজ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন কেন আগাম কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করল না? শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে যদি ছাত্রীরা তাঁদের পোশাকের কারণে অন্য সহপাঠীদের দ্বারা আক্রান্ত ও শারীরিক হেনস্থার শিকার হন, তবে সেই প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছাত্রীদের নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে ঠেকছে? জাতীয় বা রাজ্য রাজনীতির ধর্মীয় বিভাজন ও মেরুকরণকে যেভাবে কলেজের পঠনপাঠনের পরিবেশের ভেতরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তাতে কাছাড় কলেজের ঐতিহ্যময় সুনাম নষ্ট হচ্ছে।
ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এনএসইউআই নেতৃত্ব স্পষ্ট অভিযোগ তুলেছেন যে, রাজনৈতিক স্বার্থে এবিভিপি শিক্ষাঙ্গনে ‘গুণ্ডামি’ চালাচ্ছে এবং বেছে বেছে সংখ্যালঘু ছাত্রীদের নিশানা করছে। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে, এবিভিপি-র পক্ষ থেকে পাল্টা দাবি করা হয়েছে যে, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করতে ও অহেতুক রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়াতেই এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
একটি স্বনামধন্য ডিগ্রি কলেজে এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সাম্প্রদায়িক পোশাক-বিতর্ক কেবল কাছাড় কলেজের সুনাম নষ্ট করছে না, বরং সমগ্র বরাক উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী সম্প্রীতি ও শিক্ষার পরিবেশকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে এই ঘটনার পেছনে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে এক নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।






