উপর দিয়ে ফিটফাট, নিচে দিয়ে সদরঘাট! ট্রাফিক সিগন্যালের সাজসজ্জা, নাকি সরকারি টাকার অপচয়?

দেখতে ঝকঝকে, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, নতুন পোস্ট, নতুন ব্যবস্থা সবই ভালো। একটি শহরে উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা অবশ্যই দরকার। যানজট কমাতে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং শহরকে আধুনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে ট্রাফিক সিগন্যাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই উন্নত ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো নিয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। সরকারি টাকা খরচ করে যে কাজ আজ হচ্ছে, সেটি আগামীকালই যদি ভেঙে ফেলতে হয়, তাহলে সেই কাজের যৌক্তিকতা কোথায়?

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইটিএমএস) নামে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার একটি প্রকল্পের শিলান্যাস করা হয়। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক দিবাই চক্রবর্তী, তৎকালীন জেলাশাসক মৃদুল যাদব এবং তৎকালীন পুলিশ সুপার নুমাল মাহাত্তা।

এই কাজের বরাত পায় কলকাতার অ্যাডভান্স ডিজিটাল সলিউশন নামে একটি সংস্থা। সব ঠিক আছে। প্রকল্প হয়েছে, কাজ এগিয়েছে। এখন নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল পোস্ট বসানো হয়েছে। জানা যাচ্ছে, টেস্টিংও প্রায় শেষের পথে। দু’দিন পর হয়তো নিয়মিতভাবেই সিগন্যাল চালু হয়ে যাবে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর।

শহরের ট্রাফিক সিগন্যালের আধুনিকীকরণ হবে, উন্নত মানের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা হবে, আমরাও উন্নত শহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারব। নাগরিক হিসেবে এটিই তো আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু এখানেই এসে সামনে দাঁড়াচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমাদের জানামতে, খুব শিগগিরই শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হওয়ার কথা। বিশেষ করে ক্যাপিটাল পয়েন্ট থেকে রাঙ্গিরখাড়ি পর্যন্ত প্রস্তাবিত ফ্লাইওভার নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রস্তুতি ও সমীক্ষার কাজ এগিয়েছে। ফ্লাইওভার নির্মাণের আগে প্রকৌশলগতভাবে যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন, সেগুলিও চলছে।

সহজ করে বললে, একজন রোগীর চিকিৎসার আগে ডাক্তার যেমন একের পর এক পরীক্ষা করেন, তেমনই একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের আগে ইঞ্জিনিয়ারদেরও বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়। মাটি পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রকৌশলগত বিষয় খতিয়ে দেখার কাজ এগিয়ে চলেছে। অর্থাৎ একদিকে ফ্লাইওভার নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে ঠিক সেই সময়েই শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নতুন ট্রাফিক সিগন্যালের পোস্ট বসানো হচ্ছে এবং তার টেস্টিংও প্রায় শেষ।

তাহলে প্রশ্ন এই পোস্টগুলো আদৌ কতদিন টিকবে? আরও স্পষ্ট করে বললে, যদি ক্যাপিটাল পয়েন্ট থেকে রাঙ্গিরখাড়ি পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কাজ বাস্তবে শুরু হয়, তাহলে ইউটিলিটি শিফটিং, রাস্তার বিন্যাস পরিবর্তন কিংবা নির্মাণকাজের প্রয়োজনে এই ট্রাফিক সিগন্যালের পোস্টগুলো কি সরাতে হবে না? যদি সরাতেই হয়, তাহলে আজ এই পোস্টগুলো বসানোর আগে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাটা কি মাথায় রাখা হয়েছিল?

যদি আগামী দিনে ফ্লাইওভারের কাজের জন্য এই পোস্টগুলো উপড়ে ফেলতে হয়, তাহলে কয়েক মাস আগে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে এগুলো বসিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত? সরকারি টাকা তো কারও ব্যক্তিগত টাকা নয়। এই টাকা জনগণের টাকা।

একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করার সময় শুধু আজকের প্রয়োজন দেখলেই হয় না। আগামী দিনের পরিকল্পনাও দেখতে হয়। বিশেষ করে যখন একই এলাকায় আরও বড় একটি অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে, তখন দুই প্রকল্পের মধ্যে সমন্বয় থাকা অত্যন্ত জরুরি। নইলে কী হবে? আজ কোটি কোটি টাকা খরচ করে ট্রাফিক সিগন্যাল বসবে। কাল ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হবে। তখন ইউটিলিটি শিফটিং বা নির্মাণকাজের অজুহাতে সেই পোস্ট সরাতে হবে। নতুন করে খরচ হবে। কোথাও পুরনো কাজ ভাঙবে, কোথাও নতুন কাজ হবে।

তাহলে প্রশ্ন উঠবেই এই খরচের পরিকল্পনা কোথায় ছিল? আর যদি বলা হয় যে ফ্লাইওভারের কাজ এখনও নিশ্চিত নয়, তাহলে প্রশ্ন আরও সরাসরি প্রকল্পের পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা, সমীক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের বিষয়গুলো বিবেচনা করেই কি আইটিএমএস-এর পোস্ট বসানোর স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে? জনগণের সামনে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আসা দরকার। কারণ আমরা উন্নয়নের বিরুদ্ধে নই। বরং আমরা চাই শহরে আরও উন্নয়ন হোক।

উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থা হোক, ফ্লাইওভার হোক, রাস্তা উন্নত হোক, নিকাশি ব্যবস্থা আধুনিক হোক সবই হোক। কিন্তু উন্নয়ন যেন এক প্রকল্প করে আরেক প্রকল্প ভাঙার নাম না হয়। শহরের রাস্তা গর্তে ভরা থাকবে, নালা-নর্দমা পরিষ্কার হবে না, জল জমে থাকবে আর তার মাঝখানে কোটি টাকা খরচ করে ঝকঝকে ট্রাফিক সিগন্যাল দাঁড়িয়ে থাকবে; এই দৃশ্য যদি আগামী দিনে দেখা যায়, তাহলে মানুষ প্রশ্ন করবেই।

আর সেই প্রশ্নটা খুব সাধারণ উপর দিয়ে ফিটফাট, নিচে দিয়ে সদরঘাট এটাই কি আমাদের উন্নয়নের মডেল? আজ ট্রাফিক সিগন্যালের পোস্ট দাঁড়িয়ে আছে। দু’দিন পর সিগন্যাল চালু হবে। মানুষ খুশি হবে। আমরাও খুশি হব। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, এই খুশি যেন কয়েক মাস পর সরকারি টাকা অপচয়ের আক্ষেপে পরিণত না হয়।

ফ্লাইওভার যদি হয়, তাহলে আগে থেকেই পরিকল্পনা কোথায় ছিল? ফ্লাইওভারের জন্য যদি পোস্ট সরাতেই হয়, তাহলে আগে কেন বসানো হলো? আর যদি সরাতে না হয়, তাহলে কীভাবে একই এলাকায় ফ্লাইওভার ও আইটিএমএস দুই প্রকল্পের কাজ সমন্বয় করে করা হবে?

এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর চাই। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের উদ্বোধন, শিলান্যাস, ঝকঝকে পোস্ট কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির প্রচার এসবের চেয়েও বড় বিষয় হলো, সেই প্রকল্প সত্যিই কতটা স্থায়ী, কতটা কার্যকর এবং কতটা জনস্বার্থে। উন্নয়ন চাই, অবশ্যই চাই। কিন্তু এমন উন্নয়ন নয়, যেখানে আজ সরকারি টাকা খরচ করে কিছু তৈরি হবে আর কাল সেই সরকারি টাকাতেই সেটি সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন পড়বে। জনগণের টাকা দিয়ে উন্নয়নের নামে যেন ‘তৈরি করো, আবার ভেঙে ফেলো’ প্রকল্প না চলে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

Related Posts

ছত্তিশগড়ের রাজ্যপাল রমেন ডেকাকে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ও পোস্ট শেয়ার করার ঘটনায় হাই কোর্টের বিশেষ রায়

সাংবিধানিক পদের অবমাননা মামলা: নিঃশর্ত ক্ষমা ও কড়া শর্তে স্বস্তি পেলেন দুই যুবক বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ ছত্তিশগড়ের রাজ্যপাল রমেন ডেকাকে নিয়ে আপত্তিকর কার্টুন ও মন্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ…

সুপ্রিম কোর্টে স্বস্তি কংগ্রেসের, গৌহাটি হাইকোর্টে ফিরল মামলা, আইনি সুতোয় ঝুলছে বিজেপি সাংসদ কৃপানাথ মাল্লার ভাগ্য!

১৮ হাজার ভোটের জয় নিয়ে এবার আইনি আতশিকাঁচের নিচে বিজেপি সাংসদ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ আগষ্টঃ করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) লোকসভা কেন্দ্রের ২০২৪ সালের নির্বাচনী লড়াই কি তবে শেষ হয়েও শেষ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *