আইপিএল মরশুমে ফের মাথাচাড়া জুয়া সিন্ডিকেট!

স্থানীয় সূত্র এবং বাসিন্দাদের অভিযোগ, এবার জুয়ার চক্র আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি সংগঠিত, আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর এবং আরও বেশি বেপরোয়া। আগে যেখানে গোপনে ফোনকল, কাগজের স্লিপ কিংবা নির্দিষ্ট আড্ডাকেন্দ্রের মাধ্যমে বেটিং পরিচালিত হতো, এখন সেই জায়গা দখল করেছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। মোবাইল ফোন, এনক্রিপ্টেড চ্যাট, কোড নম্বর এবং অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলছে প্রতিদিন।

অভিযানের বদলে নীরবতা কেন? প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল। সমাজবিদদের অভিযোগ, এই জুয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ছে যুবসমাজের ওপর। ক্রিকেটপ্রেমের মোড়কে তরুণদের টেনে নেওয়া হচ্ছে দ্রুত অর্থলাভের মরীচিকায়। প্রথমে ছোট অঙ্কের বাজি, তারপর আসক্তি, ঋণ, পারিবারিক অশান্তি শেষ পর্যন্ত বহু পরিবার আর্থিক ধ্বংসের মুখে পড়ছে। বহু যুবক কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হারিয়ে মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বলেও অভিযোগ।

সবচেয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ, একাংশ খাকি পোশাকধারীর মদতেই এই জুয়ার কারবার চলছে নির্বিঘ্নে। স্থানীয়দের ভাষায়, এক ম্যানেজ মাস্টার পুলিশকর্মীর মাধ্যমেই থানার সঙ্গে বুকিদের লেনদেন পরিচালিত হয়। অভিযোগ উঠেছে, জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্তাকে অন্ধকারে রেখে নিচুতলার একাংশের মদতেই চলছে এই কারবার। যদিও এসব অভিযোগের সরকারি সত্যতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় ক্রমশ গভীর হচ্ছে।

সম্প্রতি জেলা পুলিশের সর্বময় কর্তাব্যক্তির কানে বিষয়টি পৌঁছানোর পর সব থানা ও ফাঁড়ির ইনচার্জদের কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। তার জেরে সোমবার শহরের প্রায় সব বুকিই সাময়িকভাবে কারবার বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু সেই বিরতি ছিল ক্ষণস্থায়ী। অভিযোগ, বৃহস্পতিবার ম্যাচ শুরুর আগেই আবার খুলে যায় দোকান। আর এখানেই নতুন প্রশ্ন, তাহলে কি আবার সক্রিয় হয়েছে সেই পুরনো ম্যানেজ ফর্মুলা? সবাই কি ফের সমঝোতায় ফিরে গেছে?

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ, এই নতুন সিন্ডিকেট আগের তুলনায় অনেক বেশি ম্যানেজমেন্ট নির্ভর। অর্থাৎ, শুধু জুয়া পরিচালনাই নয়, এর পেছনে নাকি রয়েছে এক ধরনের সুরক্ষা বলয়, যা তাদের কার্যক্রমকে টিকিয়ে রাখতে সহায়ক। যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক সত্যতা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবুও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ানো এই অভিযোগ প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

ক্রিকেটের উন্মাদনার আড়ালে যদি এমন অবৈধ বেটিং নেটওয়ার্ক ক্রমশ শিকড় গেড়ে বসে, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সামাজিক অবক্ষয়েরও বড় ইঙ্গিত এমনটাই মত সচেতন মহলের। এখন দেখার, এই অভিযোগগুলিকে প্রশাসন কতটা গুরুত্ব দেয়, এবং ডিজিটাল জুয়ার এই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আদৌ কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।

অভিযোগ উঠছে, শিলচরে আইপিএল কেন্দ্রিক জুয়ার সিন্ডিকেট এখন আর বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত কোনও ছোটখাটো চক্র নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে, যার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র হিসেবে বারবার উঠে আসছে সোনাই রোড, হাইলাকান্দি রোড ও রাঙ্গিরখাড়ি এলাকার নাম। স্থানীয়দের দাবি, এই অঞ্চলকে ঘিরেই ডিজিটাল বেটিং চক্রের মূল কারবার পরিচালিত হচ্ছে, যেখান থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অভিযোগ।

সবকিছুই চলে কোড নম্বর, ভুয়ো পরিচয়, গোপন আইডি এবং মোবাইল ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে, ফলে সাধারণ মানুষের চোখে ধরা না পড়লেও এই চক্রের বিস্তার নাকি দিন দিন বাড়ছেই। এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিকরা যদি প্রকাশ্যেই এত বিপুল অঙ্কের অবৈধ আর্থিক লেনদেন চলতে পারে, তাহলে তা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে সম্ভব কীভাবে? কোথাও কি নজরদারির ঘাটতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনও ম্যানেজমেন্ট চক্র এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে শহরজুড়ে।

স্থানীয় মহলের মতে, পরিস্থিতি কিন্তু সবসময় এমন ছিল না। বিগত বছরে তৎকালীন পুলিশ সুপার রমনদীপ কৌর এবং নোমান মাহাতোর আমলে কড়া নজরদারি ও অভিযানের জেরে বহু পুরনো বুকি কার্যত গা ঢাকা দিতে বাধ্য হয়েছিল। এক সময় যে নেটওয়ার্ক শহরে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছিল, তা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছিল প্রশাসনিক কড়াকড়িতে। কিন্তু চলতি মরশুমে ছবিটা নাকি সম্পূর্ণ উল্টো।

অভিযোগ, এবছর নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সেই সিন্ডিকেট। তবে শুধু পুরনো চক্রের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং নতুন বুকিদের উত্থান আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পুরনোদের জায়গায় নতুন প্রজন্মের বুকিরা আরও শক্তিশালী যোগাযোগ, প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল এবং বিস্তৃত নেটওয়ার্ক নিয়ে মাঠে নেমেছে। ফলে কারবারও হয়েছে আরও সংগঠিত, আরও অদৃশ্য, এবং আরও প্রভাবশালী।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, বিষয়টি আর শুধুমাত্র অবৈধ জুয়ার প্রশ্ন নয়, এটি আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক অবক্ষয় এবং প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন। কারণ জুয়ার টাকা কোথায় যাচ্ছে, কোন অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তারও উত্তর মিলছে না। এক প্রবীণ নাগরিকের অভিযোগ, পাড়ায় পাড়ায় ছেলে নষ্ট হচ্ছে, কোটি টাকার জুয়া চলছে, অথচ প্রশাসন নীরব, এটা সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারছে না।

শহরবাসীর দাবি, শুধু নামমাত্র অভিযান নয়, প্রয়োজন সিন্ডিকেটের মূল শিকড়ে আঘাত। ডিজিটাল বেটিং চক্র ভাঙতে সাইবার নজরদারি, আর্থিক লেনদেনের ট্র্যাকিং, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা এবং পুলিশি ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এই চার দিকেই একযোগে পদক্ষেপ দরকার।

কারণ প্রশ্নটা এখন শুধুই আইপিএল জুয়ার নয় প্রশ্ন, শিলচর কি ধীরে ধীরে ডিজিটাল বেটিং মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে? আর যদি অভিযোগ সত্যি হয়, তবে ম্যানেজ ফর্মুলার আড়ালে কারা রক্ষা করছে এই কোটি টাকার অন্ধকার সাম্রাজ্য? এখন দেখার, প্রশাসন এই অভিযোগগুলোকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখে, আর শহরবাসীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভের জবাব আদৌ আসে কি না।

Related Posts

শিলচরের লাইফলাইন মরণফাঁদে পরিণত! প্রশাসনিক উদাসীনতায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম যোগাযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড আজ যেন অবহেলা, ভোগান্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই…

শিলচর পলিটেকনিক্যাল কলেজের সামনে ফুটপাত দখল করে জুয়ার আসর!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজার হাজার মানুষ রোগী ও তাঁদের পরিজন, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী…