বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ কাছাড় জেলার শিক্ষাঙ্গনে শনিবার সকাল যেন আচমকাই এক অগ্নিগর্ভ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে রইল। কালাইন সত্যরঞ্জন কলেজ-এ তৈরি হওয়া উত্তপ্ত পরিস্থিতি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, অব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক অসংগতি মিলিয়ে এক বিস্ফোরণের ইঙ্গিত বহন করছে। সকালের অন্য দিনের মতোই কলেজ প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেছিলেন ছাত্রছাত্রীরা।
কিন্তু দিনের শুরুতেই পরিস্থিতি মোড় নেয় অপ্রত্যাশিত দিকে। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মিহির সিনহা যখন গেটে পৌঁছন, তখনই একাংশ ছাত্রছাত্রী তাঁকে আটকে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। শুরু হয় তীব্র বাকবিতণ্ডা একদিকে প্রশাসনের প্রতিনিধি, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অধ্যক্ষ কলেজে ঢোকার আগেই তাঁকে ঘিরে ধরে ছাত্রছাত্রীরা। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, নিয়ম সবার জন্য সমান। অভিযোগ, কলেজ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি একটি নির্দেশ জারি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে সকাল সাড়ে দশটার পর আর কাউকে কলেজে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। সেই নিয়মের প্রয়োগ নিয়েই এদিনের প্রতিবাদ।
উত্তপ্ত কালাইন কলেজ চত্বর, নিয়মের নামে বৈষম্যের অভিযোগ, ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্রসমাজ
ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন, যদি নিয়ম থাকে, তবে তা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, অধ্যক্ষ ব্যতিক্রম কেন? তবে ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। উত্তেজনা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে অধ্যক্ষ বাধ্য হয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য চান। অবশেষে পুলিশি হস্তক্ষেপে তিনি কলেজে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। কিন্তু ততক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে একাধিক প্রশ্ন, যা এখন গোটা এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ঘটনার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক আরও জল্পনা উসকে দিয়েছে, অধ্যক্ষকে আটকে দেওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট আগেই আরও দুইজন শিক্ষককে কলেজে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রতিবাদ কি শুধুই নিয়ম রক্ষার জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীরতর অসন্তোষ? অধ্যক্ষ মিহির সিনহা অবশ্য নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
তাঁর বক্তব্য, আমি কলেজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এই নিয়ম চালু করেছি। অনেকেই নিয়মিত দেরিতে আসেন, ফলে পড়াশোনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে একজন অধ্যক্ষ হিসেবে আমার প্রশাসনিক কাজ থাকে, কখনো দেরি হওয়া স্বাভাবিক। এইভাবে গেটে আটকে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
পুরনো সমস্যায় জর্জরিত কলেজে নতুন নিয়মে আগুনে ঘি, পুলিশের হস্তক্ষেপে মেটাল উত্তেজনা
কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ শুধু এই একটি নিয়মকে ঘিরে নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন অনেকেই। তারা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছে। প্রথমত, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ। পড়ুয়াদের দাবি, অনেক সময় শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন বা ক্লাস যথাসময়ে হয় না। ফলে পাঠ্যসূচি অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোগত দুরবস্থা।
পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব, বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট এবং অনিয়মিত বিদ্যুৎ পরিষেবা সব মিলিয়ে শিক্ষার পরিবেশ প্রশ্নের মুখে। তৃতীয়ত, আর্থিক অভিযোগ। ছাত্রছাত্রীদের একাংশ দাবি করেছে, অতিরিক্ত ফি নেওয়া হচ্ছে, অথচ তার অনুপাতে পরিষেবা নেই। চতুর্থত, পরীক্ষাকেন্দ্র অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এতে যাতায়াতে বাড়তি খরচ ও মানসিক চাপ বাড়ছে বলে অভিযোগ।
এই সমস্ত অভিযোগের জবাবে অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, তিনি সদ্য দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং নির্বাচন সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত থাকায় পর্যাপ্ত সময় পাননি। তাঁর কথায়, মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে বহু বছরের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে সব ঠিক করার চেষ্টা করছি। পরীক্ষাকেন্দ্র সরানোর প্রসঙ্গে তিনি জানান, কলেজে নতুন ভবনের কাজ চলায় স্থানাভাব দেখা দিয়েছে, তাই সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর ফি বৃদ্ধির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আগের বছরের মতোই একই হারে ফি নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যে সমস্যাগুলি ছাত্রছাত্রীরা তুলে ধরছে, সেগুলি কি শুধুই পুরনো সমস্যা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়? নাকি প্রশাসনের আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন? এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একটি বড় বাস্তবতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ম আর বাস্তবতার মধ্যে ফাঁক যত বাড়বে, ততই বাড়বে সংঘাত।
একদিকে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে মৌলিক সুবিধার অভাব এই দ্বন্দ্বই যেন কালাইন সত্যরঞ্জন কলেজের বর্তমান চিত্র। এখন দেখার বিষয়, এই সংঘাত কি আলোচনার মাধ্যমে মিটবে, নাকি আরও বড় আন্দোলনের রূপ নেবে। আপাতত, কলেজ চত্বরের উত্তাপই ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি কেবল শুরু, পরবর্তী দিনগুলি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।


