বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহর আজ যেন নিজেই নিজের ভারে ক্লান্ত। বাজারের দখলদারি, লাগামহীন পার্কিং এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার যুগপৎ চাপে নগরজীবন ক্রমশ অচলতার দিকে এগোচ্ছে। সেন্ট্রাল রোড, রাঙ্গিরখাড়ি, হাইলাকান্দি রোড, তারাপুর, ট্রাঙ্ক রোড, ইন্ডিয়া ক্লাব, চৌমাথা, ক্য্যপিট্রল পয়েন্ট, সদরঘাট, নাজিরপট্টি, শিলংপট্টি, ক্লাব রোড, হাসপাতাল রোড সহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সড়কেই এখন একই চিত্র, যেখানে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই পার্কিং। নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা নেই, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের রাস্তাগুলি যেন অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং লটে পরিণত হচ্ছে।
ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে বাইক, স্কুটি, পেট্রোল ও ইলেকট্রিক অটো এবং ই-রিকশা সবাই নিজেদের মতো করে স্ট্যান্ড বানিয়ে নিয়েছে। এমনকি বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, গাড়ির মালিক রাস্তার ওপর গাড়ি ফেলে রেখে নিশ্চিন্তে নিজের কাজে চলে গেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই গাড়ি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে পথচলতি মানুষ ও যানবাহনের জন্য মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করছে।

এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভে ফুঁসছেন শহরের সাধারণ নাগরিকরা। তাঁদের প্রশ্ন সরাসরি ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা কি শুধুই কাগুজে? শুধুমাত্র চেকিং আর জরিমানা আদায়েই কি তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ, নাকি যান নিয়ন্ত্রণও তাদের কাজের মধ্যে পড়ে? নাগরিকদের অভিযোগ, শহরে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কোনও কার্যকর উপস্থিতি নেই। নিয়ম ভাঙা যেন এখন স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়েছে।
শহরের রাস্তায় অরাজকতা, ট্রাফিক আইন কার্যত ভেঙে পড়ছে! যানজটে বিপর্যস্ত দৈনন্দিন জীবন
তবে পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি সামনে আসছে জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে। অভিযোগ, একাধিকবার অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে পড়েছে। জরুরি রোগী নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকার ঘটনাও নতুন নয়। শহরবাসীর আতঙ্ক যদি কোনও দিন এই যানজটের কারণে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীর মৃত্যু ঘটে, তার দায় কে নেবে? প্রশাসন কি তখনও দায় এড়াবে?
শুধু প্রশাসন নয়, সমালোচনার মুখে শাসকদলের স্থানীয় নেতৃত্বও। নাগরিক মহলের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ছাড়া এত বড় আকারে শহরের আনাচে কানাচে ব্যঙ্গের ছাতার মতো অবৈধ বাজার ও দখলদারি সম্ভব নয়। প্রশ্ন উঠছে, কেন কোনও জনপ্রতিনিধি এই বিষয়ে মুখ খুলছেন না? কেন এই স্পষ্ট অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সদিচ্ছা নেই? আরও আশ্চর্য্যের বিষয়, নগর পরিকল্পনা, ফুটপাত রক্ষা, রাস্তা দখলমুক্ত রাখা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ,

এসবই পৌর নিগমের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থতা। কর আদায়, বিজ্ঞাপন প্রচার এবং প্রকল্প ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে পৌর নিগমের কাজ। নাগরিকদের অভিযোগ, মৌলিক নগর ব্যবস্থাপনায় কার্যত কোনও নজরই নেই পৌর নিগম প্রশাসনের।
রাজপথ ও ফুটপাত ছোট বড় ব্যবসায়ীর দখলে নাগরিকদের ক্ষোভ চরমে
এদিকে জেল রোডের উদাহরণ এই ব্যর্থতার এক নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। শিফট মার্কেট এর নামে দিনের পর দিন রাস্তার বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে রাখা হচ্ছে। যে রাস্তা শহরের অন্যতম প্রশস্ত বলে পরিচিত, সেটিই আজ বাজার ও পার্কিংয়ের চাপে কার্যত অচল। পথচারী থেকে শুরু করে যানবাহন সকলের জন্যই এই রাস্তা এখন ভোগান্তির শিকার। এখানে বড় প্রশ্ন, পৌর নিগম কি কেবল দেখেও না দেখার ভান করছে?
তারাপুর, রাঙ্গিরখাড়ি সঞ্জয় মার্কেট ঘিরে রাস্তার দুইপাশ দখল করে বসছে পসরা। দেশবন্ধু রোড থেকে প্রায় পয়েন্ট পর্যন্ত বেচাকেনা। তারাপুর, ইঅ্যান্ডডি কলোনি, সৎসঙ্গ আশ্রম রোড, চেংকুড়ি রোড, ন্যাশনাল হাইওয়ে পয়েন্ট সবখানেই একই ছবি। জনগণের অভিযোগ, শহরজুড়ে যেন ব্যাঙের ছাতার মতো বাজার গজাচ্ছে, অথচ অনুমোদনের কোনও নথি নেই, লাইসেন্স নেই, পরিকল্পনা নেই। তাহলে কারা দিচ্ছে এই দখলের অনুমতি? আইন কি শুধুই কাগজে? অবৈধ পার্কিং এখন শহরের আরেক দুঃস্বপ্ন।

নাজিরপট্টি, শিলংপট্টি, ক্লাব রোড, হাসপাতাল রোড, জানিগঞ্জ যত্রতত্র রাস্তা দখল করে পার্কিং। বাইক, স্কুটি, চারচাকা, যেন রাস্তা ব্যক্তিগত গ্যারাজ। অনেক ক্ষেত্রে মালিক গাড়ি পার্ক করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা উধাও। আর ততক্ষণ জনসাধারণ যানজটে নাভিশ্বাস। গুরুতর অসুস্থ রোগী নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার অভিযোগও উঠেছে বহুবার। এ প্রশ্ন এখন জোরালো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে?
মাঝে মধ্যে লোক দেখানো ট্রাফিক পুলিশের অভিযান চললেও পৌর নিগমের ব্যর্থতায় তিমিরে আবদ্ধ নাগরিক সমস্যা
অটো, ই-রিকশার অননুমোদিত স্ট্যান্ডকে দিচ্ছে প্রশ্রয়? বৈধ স্ট্যান্ড বাদ দিয়ে শহরের প্রায় প্রতিটি মোড়ে গড়ে উঠেছে অননুমোদিত অটো ও ই-রিকশা স্ট্যান্ড। রাস্তা দখল করে যাত্রী তোলা, মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা, ওভারটেকের দৌরাত্ম্য সব মিলিয়ে বিশৃঙ্খলা চরমে। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিযান দেখানো হয় কেবল লোকদেখানো। কয়েকদিন পরই আগের অবস্থায় ফিরে যায় সব।
অভিযোগ আরও গুরুতর, মাঝে মধ্যে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী কোনও সমাধান আনতে পারছে না। কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যাচ্ছে। নাগরিকদের দাবি, এই অভিযানগুলি মূলত ছোট হকারদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়, অথচ বড় দখলদারি চক্র ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি ক্ষমতাশালীদের জন্য আলাদা নিয়ম?

জনমনে প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, জেলা প্রশাসক কি শহরের বাস্তব পরিস্থিতি জানেন না? পুলিশ প্রশাসন কেন অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ? পৌর নিগম কেন ফুটপাত পুনরুদ্ধারে উদ্যোগী নয়? ট্রাফিক পরিকল্পনা কোথায়? রাস্তা দখলমুক্ত করার রোডম্যাপ কী? প্রশ্নের উত্তর নেই। আছে কেবল নীরবতা। গোদের উপর বিষফোঁড়া, শিফট মার্কেট এবং পার্কিং দখলে সেই সুবিধাও আজ অর্থহীন। দিনের বড় অংশ রাস্তা বাজারের নিয়ন্ত্রণে। শহরবাসীর অভিযোগ, এ যেন সরকারি অনুমোদিত বিশৃঙ্খলা।
কার ছত্রছায়ায় চলছে অবৈধ সাম্রাজ্য? মাসোহারা, ভোটব্যাঙ্ক আর দখল রাজনীতির অভিযোগে সরব নাগরিক সমাজ
শহর কি দখলমুক্ত হবে, নাকি বিশৃঙ্খলাই নতুন স্বাভাবিক? শিলচরবাসীর ক্ষোভ এখন আর নিছক অসন্তোষে সীমাবদ্ধ নয়, তা রূপ নিচ্ছে নাগরিক প্রশ্নে। শহর কি দখলদারদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে? শহরবাসীর প্রশ্ন এখন আরও তীক্ষ্ণ, কার মদতে গড়ে উঠছে, এই অবৈধ বাজার? কেন প্রশাসন কার্যত নিষ্ক্রিয়? কেন পৌর নিগম দায়িত্বজ্ঞানহীন? এবং কেন শাসকদল নীরব দর্শকের ভূমিকায়?
এই প্রশ্নগুলো আর শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং নাগরিক অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি শহর তখনই বাঁচে, যখন তার রাস্তা চলাচলের উপযোগী থাকে, জরুরি পরিষেবা বাধাহীনভাবে কাজ করতে পারে এবং প্রশাসন নাগরিক স্বার্থে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু শিলচরের বর্তমান চিত্র ঠিক তার উল্টো।

যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে, তবে খুব শিগগিরই যানজটে জর্জর শিলচর নামটি বদলে ‘অচল শিলচর’হয়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা আর অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখন সময় এসেছে কঠোর সিদ্ধান্তের। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ জেলা প্রশাসন, পুলিশ, পুরনিগম এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব সবাইকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে।
দখলদারি উচ্ছেদ, নির্দিষ্ট পার্কিং জোন তৈরি, কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া এই সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। শিলচরের মানুষ আজ উত্তর চাইছে। শুধু আশ্বাস নয়, চাই দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কারণ, এই শহরকে বাঁচাতে হলে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে, আগামীকাল হয়তো খুব দেরি হয়ে যাবে।


