উন্নয়ন নাকি শুধু প্রচার? পঞ্চায়েত কার্যকলাপে অসন্তোষ গ্রামজুড়ে

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে উন্নয়নের বহু হিসেব দেখানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন তেমনভাবে চোখে পড়ে না। রাস্তা, নিকাশি, পানীয় জল, আলো, এসব মৌলিক ক্ষেত্রেই এখনও বহু জায়গায় সমস্যা আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে নির্বাচনের পর এক বছর পার হলেও উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র নিয়ে হতাশা ক্রমশ বাড়ছে। গ্রামবাসীদের একাংশের মতে, বর্তমান পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃতিত্ব দখলের রাজনীতি।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প যেমন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন, এমজিএনরেগা এবং স্বচ্ছ ভারত মিশন এসবের অধীনে হওয়া কাজকেও পঞ্চায়েতের নির্বাচিত বা মনোনীত প্রতিনিধিরা নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করছেন। ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন, কোন কাজটি প্রকৃতপক্ষে পঞ্চায়েত তহবিলের আওতায় হয়েছে, আর কোনটি সরকারি প্রকল্পের অংশ, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে না। গ্ৰামের একজন প্রবীণ অভিযোগ করে বলেন, সরকারের প্রকল্পে বাড়ি হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে, এসব ভালো কথা।

কিন্তু পঞ্চায়েত নিজে কী করছে, সেটার তো হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না। মনোনীত জেলা পরিষদ সদস্য, এপি সদস্য ও গ্রুপ সদস্যদের কার্যকলাপ নিয়েও উঠছে একাধিক প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রতিনিধিরা নিজেদের গ্রামে কী উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন, তার কোনো সুস্পষ্ট তালিকা বা তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরেননি। ফলে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় যাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চেয়েছিলেন, এখন তাঁদের অনেকেরই আর দেখা মেলে না। ভোটের আগে আশ্বাসের বন্যা থাকলেও বাস্তবের মাঠপর্যায়ের চিত্র যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প বলছে। বহু গ্রামে এখনও কাঁচা রাস্তা আগের মতোই বেহাল অবস্থায় পড়ে রয়েছে, পানীয় জলের সমস্যা মেটেনি, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে ভোগান্তি বাড়ছে, আর রাতের পর্যাপ্ত আলোর অভাবে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর উন্নয়নের নামে বরাদ্দ এলেও তার বাস্তব প্রতিফলন গ্রামাঞ্চলে চোখে পড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, পঞ্চায়েত তহবিলের বরাদ্দ অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে? উন্নয়নের নামে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তব অগ্রগতি কতদূর, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

গ্রামবাসীদের একাংশ এখন সরাসরি জবাবদিহিতা দাবি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, পঞ্চায়েতের আওতায় হওয়া প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজের বিস্তারিত হিসেব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কোথায় কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কোন প্রকল্পে কত ব্যয় হয়েছে, সেই খরচের বিপরীতে বাস্তবে কী কাজ হয়েছে, এই সব তথ্য স্বচ্ছভাবে সামনে আনার দাবি উঠছে।

এক যুবক গ্রামবাসীর ক্ষোভে ফুটে উঠেছে জনমানসের হতাশা, শুধু ফ্লেক্স, ব্যানার আর পোস্টারে উন্নয়নের ছবি দেখালে হবে না, মানুষ মাটিতে কাজ দেখতে চায়। রাস্তা, জল, আলো এসব মৌলিক পরিষেবা না মিললে উন্নয়নের দাবি কাগজেই থেকে যায়। গ্রামবাসীদের মতে, এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দরকার জবাবদিহিতা এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় প্রচারে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিবর্তনে।

এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যথাযথ তদারকি ও অডিট ব্যবস্থা না থাকলে উন্নয়নমূলক কাজের স্বচ্ছতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে, এমনটাই মনে করছেন সচেতন মহল। এক বছর আগে যে আশার আলো নিয়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল, আজ সেই আলো অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে বলে মনে করছেন গ্রামবাসীরা।

উন্নয়নের বাস্তব চিত্র আর প্রচারের মধ্যে ফারাক যতদিন থাকবে, ততদিন এই অসন্তোষ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা। এখন দেখার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিরা এই প্রশ্ন ও ক্ষোভের জবাব কীভাবে দেন, আর আদৌ কি গ্রামোন্নয়নের প্রকৃত চিত্র সামনে আসে, নাকি সবকিছুই থেকে যায় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।

Related Posts

শিলচরের লাইফলাইন মরণফাঁদে পরিণত! প্রশাসনিক উদাসীনতায় প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম যোগাযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড আজ যেন অবহেলা, ভোগান্তি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনজীবনের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই…

শিলচর পলিটেকনিক্যাল কলেজের সামনে ফুটপাত দখল করে জুয়ার আসর!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৮ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ মেডিকেল কলেজ রোড। প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন হাজার হাজার মানুষ রোগী ও তাঁদের পরিজন, ছাত্র-ছাত্রী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী…