বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ হাইলাকান্দি জেলার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হল। অবৈধ বেসরকারি বিদ্যালয়ের দৌরাত্ম্য, শিক্ষা প্রশাসনে কথিত দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং ছাত্রছাত্রীদের অধিকার বঞ্চনার অভিযোগে ফের সরব হয়েছে কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি (কেএমএসএস) ও ছাত্র মুক্তি সংগ্রাম সমিতি (ছএমএসএস)। বৃহস্পতিবার দুই সংগঠনের প্রতিনিধিরা জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি পেশ করে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
শুধু অভিযোগ নয়, স্মারকলিপিতে শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দেওয়া একাধিক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন লস্কর, আমির হোসেন মজুমদার এবং ছাত্র মুক্তি সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক খাইরুল ইসলাম বড়ভুইয়া ও মুস্তাফিজুর রহমান লস্কর।
হাইলাকান্দির শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ, সরব কৃষক মুক্তি ও ছাত্র মুক্তি সংগ্রাম সমিতি
সংগঠনগুলির অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বৈধ অনুমোদন বা সরকারি স্বীকৃতি ছাড়াই বহু বেসরকারি বিদ্যালয় গজিয়ে উঠেছে, যেগুলি কার্যত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং নিয়ন্ত্রণহীন বাণিজ্যিক কারবারে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠান অন্য স্বীকৃত বিদ্যালয়ের কোড ব্যবহার করে বেআইনিভাবে ছাত্র ভর্তি করছে, পরীক্ষা পরিচালনা করছে এবং শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক নিয়মকানুনকে প্রকাশ্যে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে।
আরও বিস্ফোরক অভিযোগ, এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস, জাল একাডেমিক নথি তৈরি এবং শিক্ষা সেতু পোর্টালের নিয়ম লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অনিয়ম। যদি অভিযোগের সামান্য অংশও সত্যি হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর সরাসরি আঘাত, এমনই মত শিক্ষামহলের একাংশের।
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু স্বীকৃত ও প্রাদেশিকীকৃত বিদ্যালয় ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্রসংখ্যা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করছে। বিশেষত পিএম-পোষণ (মিড-ডে মিল), বিনামূল্যে সাইকেল, ইউনিফর্ম এবং নিঝুত মইনা প্রকল্পের নামে বরাদ্দ অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অবৈধ বিদ্যালয়, জাল নথি ও সরকারি প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের কাছে স্মারকলিপি
সংগঠনগুলির বক্তব্য, কাগজে ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়ে সরকারি বরাদ্দ তোলা হচ্ছে, অথচ প্রকৃত শিক্ষার্থীরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব প্রকল্প দরিদ্র ও প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের সহায়তার জন্য, সেই প্রকল্পই যদি দুর্নীতির রসদ হয়ে ওঠে, তাহলে তা কেবল আর্থিক অনিয়ম নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতারণা। কৃষক মুক্তি ও ছাত্র মুক্তি সংগ্রাম সমিতির নেতাদের বক্তব্যে ক্ষোভ স্পষ্ট।
তাদের দাবি, জেলার শিক্ষাক্ষেত্রে অনিয়ম আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। আর এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থাই দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হবে। এক নেতা ক্ষোভ উগরে বলেন, স্কুল যদি জাল নথি, ভুয়ো ছাত্র আর সরকারি টাকার লুটের কেন্দ্রে পরিণত হয়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ কোথায়? এই প্রেক্ষাপটে সংগঠনগুলি একাধিক নির্দিষ্ট দাবি সামনে এনেছে।
সংগঠন দু’টির পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলি ছিল স্পষ্ট, কড়া এবং সুদূরপ্রসারী। তাদের দাবি, জেলার সমস্ত অবৈধ বিদ্যালয় অবিলম্বে চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ের নথিপত্র, অনুমোদন, ছাত্রসংখ্যা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে কথিত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা রুজু করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও জানানো হয়।
ভুয়ো ছাত্র দেখিয়ে মিড-ডে মিল, সাইকেল ও ইউনিফর্ম প্রকল্পে লুটের দাবি, তদন্তের দাবিতে সরব সংগঠন
সংগঠনগুলির বক্তব্য, সরকারি প্রকল্প, বিশেষ করে পিএম-পোষণ, বিনামূল্যে সাইকেল, ইউনিফর্ম এবং ‘নিঝুত মইনা’ প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থের ব্যবহারে বিশেষ অডিট চালু করতে হবে, যাতে কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম বা আত্মসাতের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা যায়। পাশাপাশি, আত্মসাৎ হওয়া সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধার করে দায়ীদের কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্থাও করতে হবে।
এছাড়া জেলার বৈধ ও অবৈধ বিদ্যালয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে তা জনসমক্ষে আনার দাবিও তুলেছে সংগঠন দুটি, যাতে অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্য জানতে পারেন এবং বিভ্রান্তির শিকার না হন। সংগঠনের নেতাদের বক্তব্য, কেবল তদন্ত শুরু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এই দুর্নীতির চক্র কোনওদিন ভাঙা সম্ভব নয়।
তাদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে প্রশাসনকে কড়া, স্বচ্ছ এবং দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নিতেই হবে। উল্লেখ্য, গত ২০ ও ২২ এপ্রিল জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের নেতৃত্বে কিছু তদন্ত অভিযান পরিচালিত হয়। এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও সংগঠনগুলি স্পষ্ট করেছে, এতে সন্তুষ্ট নয় তারা। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও আপস হবে না। প্রয়োজনে রাজপথে নেমে লাগাতার আন্দোলন চলবে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, এত অভিযোগ, এত অনিয়ম, এত কথিত জালিয়াতি যদি চলেই থাকে, তবে শিক্ষা প্রশাসন এতদিন কী করছিল? অবৈধ বিদ্যালয় যদি বছরের পর বছর চলে, ভুয়ো ছাত্র দেখিয়ে সরকারি অর্থ তোলা হয়, তাহলে নজরদারির দায় কার? এই প্রশ্ন এখন শুধু সংগঠনগুলির নয়, সাধারণ মানুষেরও। স্মারকলিপি জমা পড়েছে। অভিযোগও গুরুতর।
এখন দেখার, শিক্ষা দফতর এটিকে নিয়মমাফিক রুটিন অভিযোগ হিসেবে ফাইলবন্দি করে, নাকি সত্যিই দুর্নীতির শিকড়ে হাত দেয়। কারণ বিষয়টি শুধু কয়েকটি স্কুল বা কিছু অনিয়মের নয়, এটি পুরো জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার সততা, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। এখন নজর, প্রশাসন জাগে, নাকি অভিযোগের ভারেই চাপা পড়ে যায় সত্য।


