বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ ডিমা হাসাও জেলার হারাঙ্গাজাওর দলাইচুঙ্গা গ্রামে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল ভূমি ক্ষতিপূরণ ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতিপূরণ বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা এবার আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষকে দেওয়া চূড়ান্ত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ না মেলায় মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন দলাইচুঙ্গা বাসিন্দারা।
ক্ষতিপূরণের বঞ্চনায় ফের আন্দোলন
বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা সরাসরি শিলচর-সৌরাষ্ট্র ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের চারলেন সড়ক নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়ে প্রতিবাদে সরব হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বহু প্রতীক্ষিত জাতীয় সড়ক প্রকল্প ফের অনিশ্চয়তার মুখে পড়ায় প্রশাসনিক স্তরেও চাপ বাড়ছে। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি আগামী দু’দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না মেটালে কেবল নির্মাণকাজই নয়, জাতীয় সড়কের কাজ সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ১৪ এপ্রিল ভূমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবিতে দলাইচুঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক যোগেশ রাওয়াতকে দুই দিনের চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির অভিযোগ ছিল, দীর্ঘদিন ধরে আশ্বাসের বন্যা বইলেও বাস্তবে ক্ষতিপূরণ প্রদানে কোনও সদিচ্ছা দেখা যায়নি। সেই সময় গ্রামবাসীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ মেটানো না হলে চারলেন নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কিন্তু সময়সীমা পেরিয়ে পাঁচদিন কেটে গেলেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন না হওয়ায় মঙ্গলবার সেই হুঁশিয়ারিই বাস্তবায়িত করলেন গ্রামবাসীরা। ডিমা হাসাও জেলার জাটিঙ্গা থেকে হারাঙ্গাজাও পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার শিলচর-সৌরাষ্ট্র ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের চারলেন সড়ক নির্মাণের জন্য দলাইচুঙ্গা গ্রামের বহু পরিবারের কৃষিজমি, বাগান এবং বসতভিটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভিযোগ, মূল অধিগ্রহণের বাইরেও অতিরিক্ত জমি প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করা হলেও তার কোনও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আজ পর্যন্ত মেলেনি।
শিলচর-সৌরাষ্ট্র ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের চারলেন নির্মাণকাজ বন্ধ করল করলেন গ্রামবাসীরা
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কারণে বহু পরিবার জীবিকা হারানোর মুখে পড়েছে। কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলের বাগান নষ্ট হয়েছে, বসতভিটে ভেঙে গেছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের ফাইল এখনও প্রশাসনিক জটেই আটকে। ক্ষোভের অন্যতম বড় কারণ, এই ক্ষতিপূরণ ইস্যুতে ইতিমধ্যেই চারবার জরিপ হয়েছে। ডিমা হাসাও জেলা প্রশাসন, উত্তর কাছাড় পার্বত্য স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের ভূমি ও রাজস্ব বিভাগ এবং জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে একাধিকবার সমীক্ষা চালালেও বাস্তবে ক্ষতিপূরণ বিতরণের কোনও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, প্রতিবার জরিপের নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে টাকা পৌঁছয়নি। ফলে প্রশাসনের আশ্বাসে আস্থা হারিয়েই আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। মঙ্গলবার আন্দোলনস্থলে এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বলেন, শিলচর-সৌরাষ্ট্র চারলেন সড়ক নির্মাণের জন্য আমাদের কৃষিজমি, বাগান, ভূমি সব নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের কোনও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। বহুবার দাবি জানিয়েছি, কিন্তু শুধু আশ্বাস ছাড়া কিছু পাইনি।
দুদিনের মধ্যে সমাধান না হলে বৃহত্তর অবরোধের হুঁশিয়ারি
আরেক বাসিন্দা আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চারবার জরিপ হয়েছে, আবারও আধিকারিকরা এসে মাপজোক করছেন। কিন্তু ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা কোথায়? দু’মাস আগেও কাজ বন্ধ করেছিলাম, তখন জেলা আয়ুক্ত আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্রুত সমস্যা মিটবে। আজও কিছু হয়নি। আর প্রতারণা মেনে নেব না।
গ্রামবাসীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী দুদিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ প্রদানের লিখিত নিশ্চয়তা না এলে জাতীয় সড়কের চারলেন প্রকল্প পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। পরিস্থিতি দ্রুত না সামলালে বৃহত্তর গণআন্দোলনেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন নয়, বাঁচার অধিকার ও ন্যায়বিচারের লড়াই।
অন্যদিকে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক যোগেশ রাওয়াত জানিয়েছেন, ভূমির ভৌগোলিক পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ক্ষতির বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় এসেছে। এজন্য কালা নামে একটি সংস্থাকে পুনরায় জরিপের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তারা ইতিমধ্যেই রিপোর্ট জমা দিয়েছে। তিনি বলেন, আজ আমরা যাচাই করতে এসেছি জরিপ যথাযথ হয়েছে কি না।
জরিপ চারবার, মেলেনি ক্ষতিপূরণ, ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের কড়া অবস্থান
সবকিছু ঠিক থাকলে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ক্ষতিপূরণ মুকলি করে দেওয়া হবে। তবে এই আশ্বাসে গ্রামবাসীরা আশ্বস্ত নন। তাঁদের বক্তব্য, বহুবার এমন প্রতিশ্রুতি মিলেছে, কিন্তু বাস্তবে ফল শূন্য। উল্লেখ্য, জাটিঙ্গা-হারাঙ্গাজাও ২৫ কিলোমিটার সড়ক চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়েও তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে যোগেশ রাওয়াত জানান, আগামী জুন মাসে অন্তত দুলেন সড়ক যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে চলমান আন্দোলন সেই সময়সীমাকেও অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। এদিকে মানদারদিছা থেকে নিরিমবাংলো পর্যন্ত জাতীয় সড়কের মেরামতির দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্মাণ সংস্থা ডি সি আজমেরার কাজ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৩ সালে সাত বছরের জন্য কাজ পেলেও গত দশ মাস ধরে কার্যত কাজ বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাজ না করায় সংস্থার বিল আটকে রাখা হয়েছে।
প্রয়োজন হলে সংস্থাটিকে ব্ল্যাকলিস্টও করা হতে পারে। দলাইচুঙ্গার এই আন্দোলন ফের একবার সামনে এনে দিল উন্নয়ন প্রকল্প ও ভূমি অধিগ্রহণের চিরাচরিত দ্বন্দ্বকে। একদিকে বহু কোটি টাকার জাতীয় সড়ক প্রকল্প, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য প্রাপ্য। উন্নয়নের নামে যদি মানুষই বঞ্চিত হন, তবে সেই উন্নয়নের ভিত্তি কতটা টেকসই এই প্রশ্নই এখন জোরালো হচ্ছে পাহাড়ি জনপদে। এখন নজর প্রশাসনের দিকে দুই দিনের আলটিমেটামের মধ্যে সমাধান সূত্র বেরোয়, নাকি আবারও থমকে যায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট করিডর প্রকল্প।


