বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের জল নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান প্রাণরেখা রাঙ্গিরখালকে কেন্দ্র করে যে আশার আলো দেখানো হয়েছিল, আজ তা অনেকটাই অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। যে প্রকল্পকে শহরবাসীর দীর্ঘমেয়াদি বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, সেই গার্ডওয়াল নির্মাণ এখন ধীরগতি, পরিকল্পনাগত প্রশ্ন এবং বাস্তবায়নের গাফিলতিতে কার্যত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রায় চার বছর আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ব্যাপক প্রচার আড়ম্বরের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এই বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্পের পথচলা। শিলান্যাসের দিন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, রাঙ্গিরখালের গার্ডওয়াল নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে শহরের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং বন্যা-দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবের চিত্র আজ ভিন্ন কথা বলছে। চার বছর অতিক্রান্ত হলেও এক কিলোমিটার কাজও পূর্ণতা না পাওয়ায় হতাশা, ক্ষোভ এবং সন্দেহ তিনই বাড়ছে শহরবাসীর মধ্যে।

ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্পের অগ্রগতি শুধু মন্থর নয়, এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিও নানাভাবে প্রশ্নের মুখে। এত বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হওয়া সত্ত্বেও কাজের এই গতি কেন, তার সদুত্তর নেই। বরং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে দিন দিন বাড়ছে ধোঁয়াশা। বিশেষ করে অবশিষ্ট প্রায় ১০ কিলোমিটার রাঙ্গিরখালের উন্নয়ন নিয়ে কী পরিকল্পনা রয়েছে, আদৌ সেই অংশের ডিপিআর তৈরি হয়েছে কি না, অথবা মুখ্যমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশ বাস্তবায়নের পথে কতটা অগ্রগতি ঘটেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরাই।
স্বপ্নের গার্ডওয়াল প্রকল্পের নকশা, প্রস্থ ও নির্মাণ পদ্ধতি নিয়ে ধোঁয়াশা, জলবন্দির শঙ্কায় শিলচর
স্থানীয়দের অভিযোগ মতে, শুধু নির্মাণের গতি নয়, কাজের মান ও পরিকল্পনাগত স্বচ্ছতা নিয়েও উঠছে গুরুতর সংশয়। যে প্রকল্পকে শহরের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে দেখা হচ্ছিল, সেটি যদি শুরুতেই এভাবে ধুঁকতে থাকে, তবে এই বর্ষায় ফের শহরবাসীকে জলবন্দি দুর্ভোগের মুখে পড়তে হবে কি না, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০২২ সালের বিধ্বংসী বন্যার স্মৃতি এখনও শিলচরের মানুষ ভুলে যাননি।
সেই প্রেক্ষাপটে রাঙ্গিরখাল প্রকল্প শুধু একটি অবকাঠামোগত উদ্যোগ নয়, এটি মানুষের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। আর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে যদি এত বড় ফাঁক থেকে যায়, তবে জনমনে প্রশ্ন উঠবেই, এ কি শুধুই প্রশাসনিক ধীরগতি, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও গভীর কোনো গলদ?
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সমস্যা শুধু কাজের ধীরগতি নয়, বরং গোটা প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতিই জনমনে গভীর সন্দেহ তৈরি করছে। তাদের ভাষায়, এখানে সর্ষের মধ্যেই ভূত। কারণ, ২০১৭ সালে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার এস. বিশ্বনাথনের বিশেষ উদ্যোগে রাঙ্গিরখালের দুপাশ থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে যে প্রস্থ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল, এখন সেই জায়গা ছেড়ে দিয়ে খালের সংকুচিত অংশ ধরে গার্ডওয়াল নির্মাণের চেষ্টা কেন তা নিয়ে বিস্ময় বাড়ছে।
দখলমুক্ত জমি ছেড়ে সংকুচিত নালায় গার্ডওয়াল, প্রশ্ন তুলছেন শহরবাসী
নগর পরিকল্পনা ও জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সচেতন মহলের বক্তব্য, খালের প্রস্থ যদি আগের মতো পুনরুদ্ধার না করেই গার্ডওয়াল নির্মাণ হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে পারে। কারণ, বছরের পর বছর দখলদারির ফলে রাঙ্গিরখালের প্রস্থ এমনিতেই আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এর উপর সংকুচিত নালাকে স্থায়ী কাঠামো দিয়ে বেঁধে দিলে শহরের সিংহভাগ জল নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়।
আরও বড় প্রশ্ন উঠছে ঠিকাদারি সংস্থার ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগ, এবারের পুরো শুকনো মরশুমে কাজ এগিয়ে নেওয়ার উপযুক্ত সময় থাকলেও জবরদখল, ডিমার্কেশন কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার মতো অজুহাত প্রায় ছিল না বললেই চলে। তারপরও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। অথচ বর্ষা নামতেই যেন কাজ থমকে পড়েছে। অনেকের মতে, বর্ষা এলেই ঠিকাদারেরা পায়তারা গুটিয়ে বসে যান। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও দগদগে। শিলচরের মানুষ ভুলতে পারেননি কীভাবে কয়েক দিনের জলে শহর কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল।
সেই দুর্যোগের পরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অন্তত এবার রাঙ্গিরখাল প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হবে। ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নিজে শিলান্যাস করে কনকপুর বাজার থেকে সানলিট হাসপাতাল পর্যন্ত ৩.৯ কিলোমিটার অংশে ৪২ কোটি টাকার প্রকল্পের সূচনা করেন। শুধু তাই নয়, অবশিষ্ট ১০ কিলোমিটারের ডিপিআর দ্রুত জমা দেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি। সে সময় শহরবাসী বিশ্বাস করেছিলেন, দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পথে বাস্তব অগ্রগতি শুরু হলো।
কিন্তু চার বছর পর বাস্তব চিত্র যেন ঠিক উল্টো কথা বলছে। এক প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সঙ্গে যেন বারবার শুধু প্রতিশ্রুতির রাজনীতি হয়েছে। প্রকল্প আছে, বরাদ্দ আছে, শিলান্যাস আছে, কিন্তু কাজ কোথায়? ২০১৯ সালে তৎকালীন জেলাশাসক লায়া মাধুরীর বৈঠকে ঘোষণা করা হয়েছিল, সিআইডিএফ তহবিলের ৪২ কোটি টাকায় সাত মিটার চওড়া ও চার কিলোমিটার দীর্ঘ গার্ডওয়াল নির্মাণ হবে। পাশাপাশি ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের সৌন্দর্যায়নে ২৫টি প্রকল্পের কথাও বলা হয়।
আজ সেই প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিক সমাজ। তাদের বক্তব্য, কার গরু কে চড়ায় এখন যেন এই প্রকল্পের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা। শিলচরের সচেতন মানুষ তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, রাঙ্গিরখাল শুধু একটি নালা নয়, এটি শিলচরের প্রধান ড্রেনেজ করিডর।

মহিষাবিল থেকে উৎপত্তি হয়ে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বাংলাঘাট হয়ে ঘাগড়া নদীতে মিশেছে এই খাল। রাঙ্গির, সিঙ্গির এবং লঙ্গাইখালের মাধ্যমে শহরের জমা জল নিষ্কাশিত হয়। ফলে এই খালের কার্যকারিতা বিঘ্নিত হওয়া মানেই শহরকে বারবার জলবন্দি হওয়ার ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া।
পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরাক উপত্যকায় অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। ফলে পুরনো জলনিকাশি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে বসে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় অনিবার্য হতে পারে। অথচ সেই সময়ে রাঙ্গির খালের মতো প্রকল্পে এমন গাফিলতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের গুণগত মান, কাজের গতি, ঠিকাদারি সংস্থার জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক মনিটরিং সব ক্ষেত্রেই যেন এক ধরনের উদাসীনতা কাজ করছে। কেউ কেউ সরাসরি দুর্নীতির গন্ধও পাচ্ছেন। তাদের প্রশ্ন, এত বিপুল অর্থের প্রকল্পে চার বছরে এই সামান্য অগ্রগতি হলে অবশিষ্ট কাজ শেষ হতে কত বছর লাগবে?
সবচেয়ে বড় কথা, বর্ষা দরজার কড়া নাড়ছে। গত কয়েক দফা বৃষ্টিতে শহরের যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নতুন করে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। মানুষ জানতে চাইছেন, আবার কি ২০২২ এর পুনরাবৃত্তি অপেক্ষা করছে? এই প্রশ্ন এখন শুধু সাধারণ মানুষের নয়, এটি প্রশাসনের কাছেও জবাবদিহির প্রশ্ন।
কারণ, রাঙ্গির খাল প্রকল্প এখন আর কেবল একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়, এটি শিলচরের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেই কারণেই শহরবাসীর একটাই দাবি, অজুহাত নয়, চাই দৃশ্যমান কাজ; প্রতিশ্রুতি নয়, চাই জবাবদিহি। নইলে রাঙ্গিরখালের গার্ডওয়াল একদিন বন্যা রোধের প্রকল্প নয়, অব্যবস্থাপনার স্মারক হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে।


