বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ আসামের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে বিরোধী শিবিরের সক্রিয়তা, জোট রাজনীতি এবং শাসকবিরোধী হাওয়া যখন রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী চিত্র ধরা পড়ে কাছাড়ের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। যেখানে বিরোধী শক্তির উপস্থিতি কার্যত অদৃশ্য, নির্বাচনী লড়াই ছিল প্রায় একপাক্ষিক, আর শাসক দলের প্রভাব যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিস্তার লাভ করে।
অথচ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কেন্দ্রেই বিরোধী শক্তি, বিশেষত কংগ্রেসের ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেই সম্ভাবনাই কি পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করা হল? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কংগ্রেসের অন্দরমহলে। বুধবার পয়লাপুল রাজীব ভবনে অনুষ্ঠিত লক্ষীপুর কংগ্রেসের একটি পর্যালোচনা সভা ঘিরে এই অসন্তোষ আরও প্রকাশ্যে চলে আসে।
অভিযোগ, প্রার্থী এম শান্তিকুমার সিংহকে ঘিরে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সভা ত্যাগ করেন দুই প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা। যদিও তাঁদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসেনি, তবে একাধিক সূত্র এই ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। দলীয় মহলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনে যিনি কার্যত মাঠেই ছিলেন না, তাঁর জবাবদিহি চাইতেই কি এই বিক্ষোভ?
লক্ষীপুর একসময় কংগ্রেসের নির্ভরযোগ্য ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০২১ পরবর্তী সময়ে একাংশ নেতৃত্ব বিজেপিতে যোগ দিলেও ভোটারভিত্তি যে এখনও কংগ্রেসমুখী, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছিল ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন ও সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত ভোটে। সংগঠনগত দুর্বলতা সত্ত্বেও লোকসভায় কংগ্রেস প্রার্থী এই কেন্দ্র থেকে ৩৫ হাজারেরও বেশি ভোট পান।
পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বহু ক্ষেত্রে কংগ্রেস প্রার্থীরা লড়াইয়ে সম্মানজনক ভোট পান। এই ফলাফল কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, যোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও লড়াকু প্রার্থী দিলে লক্ষীপুরে ফের সংগঠন পুনর্গঠিত হতে পারে। সেই প্রত্যাশা নিয়েই স্থানীয় ও বাইরের মিলিয়ে পাঁচজন টিকিটপ্রত্যাশী সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত দলীয় টিকিট যায় বিতর্কিত সোনাইয়ের এম শান্তিকুমার সিংহের হাতে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় অসন্তোষের আগুন।
টিকিট ঘোষণার পর প্রথম থেকেই শান্তিকুমারকে ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। যাঁকে প্রথমে ‘ডা: এম শান্তিকুমার সিংহ পরিচয়ে তুলে ধরা হচ্ছিল, পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে প্রচারসামগ্রী, ব্যানার-পোস্টার থেকে ডা: উপাধি উধাও হয়ে যায়। শুধু এম শান্তিকুমার সিংহ নামেই প্রচার চালানো হয়। এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা মেলেনি কখনও। এরপর যা ঘটে, তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রার্থীকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সংঘাত, অসন্তোষ ও বিভাজন। একাংশ নেতা বিজেপিতে যোগ দেন, কেউ বা নির্লিপ্ত হয়ে পড়েন, কেউ আবার বাধ্য হয়ে প্রার্থীকে মেনে নিলেও নির্বাচনী প্রচারে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকেন। অভিযোগ, প্রার্থীকে নিয়ে নেতাদের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল গভীর অবিশ্বাস। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রার্থী হিসেবে শান্তিকুমারকে মাঠে কার্যত দেখা যায়নি।
বহু গ্রামে চোখে পড়েনি তাঁর কোনো জনসভা, পথসভা, গণসংযোগ। ভোটের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি তৈরি হয়নি বলেও অভিযোগ। এমনকি যাঁরা তাঁকে জেতাতে মাঠে নামতে চেয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল শিথিল।
একাংশ নেতার বক্তব্য, তিনি কি উদ্দেশ্যে প্রার্থী হলেন, সেটাই আমরা বুঝতে পারিনি। প্রচারে নেই, সংগঠনের সঙ্গে নেই, দল ভাঙছে, তবু নীরব। আরও গুরুতর অভিযোগ, একের পর এক কংগ্রেস নেতা বিজেপিতে যোগ দিলেও তাঁদের ধরে রাখার বা ভাঙন ঠেকানোর কোনও উদ্যোগ নেননি প্রার্থী।
ভোটের দিন অধিকাংশ বুথে কংগ্রেসের এজেন্ট বা কর্মী না থাকার অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল সাংগঠনিক ব্যর্থতা নয়, এটি নির্বাচনী প্রস্তুতির সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। আরও বিস্ময়কর, ভোটের ফলের পর যখন অন্যান্য প্রার্থীরা ভোটার ও কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন, তখনও নীরব ছিলেন শান্তিকুমার এমন অভিযোগ তুলেছেন সমর্থকেরা।
এই নীরবতা এখন অনেকের কাছেই রহস্যময় ভূমিকা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সূত্রের খবর, বুধবারের পর্যালোচনা সভায় কয়েকজন প্রবীণ নেতা শান্তিকুমারের কাছে নির্বাচনী খরচ ও প্রচারের হিসাব জানতে চান। কোথায় কীভাবে প্রচার হয়েছে, দলীয় সম্পদ কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, এসব প্রশ্নের জবাব চাওয়া হয়। অভিযোগ, কোনও সদুত্তর না মেলায় ক্ষুব্ধ হয়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে যান দুই নেতা। এই ঘটনাকে অনেকেই শুধু সভা বয়কট নয়, বরং নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অনাস্থা হিসেবেই দেখছেন।
এখন দলীয় মহলে জোরালো দাবি উঠেছে, শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত এম শান্তিকুমার সিংহের ভূমিকা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা। প্রশ্ন উঠছে, যিনি নির্বাচনী লড়াইয়ে কার্যকর ছিলেন না, তিনি কীভাবে টিকিট পেলেন? কাদের সুপারিশে? কোন সমীকরণে? আরও বড় প্রশ্ন, লক্ষীপুরের মতো সম্ভাবনাময় কেন্দ্রে কি ভুল প্রার্থী বাছাইয়ের মাধ্যমে কংগ্রেসের লড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করা হয়েছে?
রাজনৈতিক মহলের মতে, লক্ষীপুরে এই পরাজয় শুধু ভোটের নয়, এটি নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা, প্রার্থী নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং সাংগঠনিক জবাবদিহিতারও পরাজয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কংগ্রেস নেতা বলেন, লক্ষীপুরে হার স্বাভাবিক ছিল না। লড়াই করার সুযোগ ছিল।
কিন্তু প্রার্থীকে ঘিরে যে রহস্যময় নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেল, তা অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার, এই ক্ষোভ ও অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দলীয় নেতৃত্ব কোনও তদন্তে যায় কি না, নাকি লক্ষীপুরের এই অদৃশ্য নির্বাচন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে রাজনৈতিক বিস্মৃতির আড়ালে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, লক্ষীপুরে ভোট শেষ হলেও বিতর্কের ভোটগণনা এখনও চলছে।


