বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ কাছাড় জেলার জিরিঘাট অঞ্চলে এক শিহরণ জাগানো অপহরণ ও নৃশংস খুনের ঘটনায় চরম চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। সোমবার ভোরবেলায় সিনেমার কায়দায় বন্দুকের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় আটঘর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা লুকু মিয়া লস্করকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে বাগখালের রাস্তার পাশে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ায় গোটা এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার দ্রুত তদন্তে নেমে জিরিঘাট থানার পুলিশ কাছাড় পুলিশের সহায়তায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। মাত্র অল্প সময়ের মধ্যেই গা ঢাকা দিয়ে থাকা চার অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। ধৃতদের মঙ্গলবার লক্ষীপুর আদালতে পেশ করা হলে আদালত তাদের তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
ধৃতদের পরিচয় জিরিঘাটের প্রতিবেশী গ্রামের সাহারুল হক লস্কর (২৭), সাজুল ইসলাম লস্কর (২৬), বাবুল হক চৌধুরী (৩৪) এবং রাঙ্গিরকারী থানার অন্তর্গত সোনাবাড়ীঘাট এলাকার সুজন আক্তার লস্কর (১৮)। পুলিশের দাবি, ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে দুটি এসবিবিএল বন্দুক, একটি .২২ ক্যালিবার পিস্তল, চার রাউন্ড তাজা গুলি এবং দুটি লাঠি। এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাই তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে।
তবে এখনো পর্যন্ত পুলিশ স্পষ্টভাবে জানাতে পারেনি, এটি ডাকাতি, ছিনতাই, নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। লুকু মিয়া লস্করের স্ত্রী ইতিমধ্যেই জিরিঘাট থানায় একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছেন। ফলে স্পষ্ট, এই ঘটনায় জড়িতদের সংখ্যা চারজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি জারি রেখেছে পুলিশ।
এদিকে, এলাকায় নানা জল্পনা-কল্পনা দানা বাঁধছে। একাংশের মতে, পুরনো জমি-সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যেই এমন সিনেমার স্টাইলে অপহরণ করে খুন করা হয়েছে। তবে পুলিশের বক্তব্য, এখনো পর্যন্ত তদন্তে এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য সামনে আসেনি যা এই ঘটনাকে ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
জিরিঘাটে বৃদ্ধ খুনে চাঞ্চল্য, ধৃত চার, মূল চক্রী এখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তদন্তে উঠে আসছে নতুন তথ্য
তদন্ত সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নারাজ তারা। যদিও এই অবস্থান সাধারণ মানুষের উদ্বেগ কমাতে পারছে না। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে অস্ত্রের উৎস নিয়ে। ধৃতদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র কোথা থেকে এল? এই চক্রের সঙ্গে কি কোনো বৃহত্তর অপরাধচক্র জড়িত? সীমান্তবর্তী এলাকার কারণে অস্ত্র পাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। দিনের আলোয় বন্দুক দেখিয়ে অপহরণ এবং পরে নির্মম খুন, এই ঘটনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, অপরাধীদের এমন দুঃসাহসিকতা আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতারই ইঙ্গিত বহন করে। এলাকাবাসীর একাংশের বক্তব্য, যদি খুনিরা এত সহজে বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
তারা অবিলম্বে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, মূল ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, পুলিশের প্রাথমিক সাফল্য প্রশংসনীয় হলেও তদন্তের স্বচ্ছতা ও দ্রুততার দিকটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গ্রেফতার নয়, এই ঘটনার পেছনের আসল কারণ ও নেটওয়ার্ক উদঘাটন করাই হবে প্রশাসনের বড় চ্যালেঞ্জ। এই ঘটনার পর জিরিঘাটে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো উচ্চপর্যায়ের বিবৃতি না আসায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। লুকু মিয়া লস্কর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি এলাকার নিরাপত্তা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক তৎপরতার ওপর এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে জিরিঘাটবাসী।


