বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ হাইলাকান্দি রেল স্টেশন যেখানে প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় জীবিকার লড়াই, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলার প্রস্তুতি। ট্রেন সময়মতো প্ল্যাটফর্মে ঢুকছে, বাঁশির শব্দে মুখর হয়ে উঠছে চারদিক তবুও সেই ট্রেনে ওঠা আজ অনেক যাত্রীর কাছেই যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে। কারণ একটাই সহজে মিলছে না প্রয়োজনীয় টিকিট। প্রতিদিনের এই দুর্ভোগ এখন যেন নিত্যচিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে হাইলাকান্দি স্টেশনে।
সাইরং–শিলচর প্যাসেঞ্জারসহ একাধিক লোকাল ট্রেন ধরতে সকাল হতেই টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। কিন্তু অভিযোগ, এই লাইন আর সাধারণ যাত্রীদের জন্য নয়, আগেভাগেই তা দখল করে রাখছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। তৎকাল টিকিটের অজুহাতে একপ্রকার অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে তারা, যার ফলে প্রকৃত নিত্যযাত্রীরা পড়ছেন চরম বিপাকে।
এজেন্সি-চক্রের দখলে কাউন্টার, তৎকাল এর নামে কারসাজির অভিযোগ
চোখে পড়ার মতো বিষয়, লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বহু মানুষই শেষমেশ টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার সময়ের চাপে বাধ্য হয়ে বিনা টিকিটে যাত্রার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে আইনভঙ্গের প্রবণতা, অন্যদিকে যাত্রীদের নিরাপত্তাও পড়ছে প্রশ্নের মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, টিকিট কাউন্টারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অঘোষিত সিন্ডিকেট।
কিছু এজেন্সি নির্ভর চক্র লাইনের বড় অংশ আগেই দখল করে নেয়, এবং পরে নিজেদের সুবিধামতো টিকিট সংগ্রহ করে। সাধারণ যাত্রীরা সেখানে কার্যত দর্শক হয়ে থাকেন। নিত্যযাত্রী তথা মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সম্পাদক সুদীপ পালের কথায়, প্রতিদিন এই ট্রেনেই আমাদের শিলচর যেতে হয়। কিন্তু টিকিট না পেলে আমরা যাব কীভাবে? তাঁর এই প্রশ্ন আজ হাজারো নিত্যযাত্রীর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে।
টিকিট না পেয়ে ফিরছেন যাত্রীরা, রেলের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ তুঙ্গে
এই সমস্যার প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত ভোগান্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সরাসরি আঘাত করছে স্থানীয় অর্থনীতি ও দৈনন্দিন কাজকর্মে। বহু ছোট ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন এই ট্রেনের উপর নির্ভরশীল। টিকিট না পাওয়ার কারণে তাঁদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আয়, রোজগার ও পড়াশোনা। অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও উঠছে একাধিক প্রশ্ন। এত বড় সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
নিত্যযাত্রীদের জন্য আলাদা কাউন্টার চালু করা, ভিড় নিয়ন্ত্রণে পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি, কিংবা ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার প্রসার এই মৌলিক উদ্যোগগুলিও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ। আজকের প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী খায়রুল ইসলাম, আলম হুসেন, সানি বড়ভুঁইয়া, সুদীপ পাল এবং জেলা মহরম কমিটির সম্পাদক হিলাল উদ্দিন লস্করসহ অন্যান্যরা একবাক্যে দাবি জানিয়েছেন, অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের বক্তব্য, রেল যদি মানুষের জন্য হয়, তবে এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থার অবসান ঘটাতে হবে এখনই।
হাইলাকান্দি স্টেশনের এই চিত্র আসলে বৃহত্তর এক ব্যবস্থাগত সমস্যার প্রতিচ্ছবি, যেখানে পরিষেবার অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য মিলেমিশে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের যাত্রাকেই করে তুলেছে দুর্বিষহ। এখন দেখার, যাত্রীদের এই দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের জেরে রেল প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। কারণ সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্তই অমূল্য, আর সেই সময় যদি নষ্ট হয় টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে, তবে উন্নয়নের দাবিগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।


