লক্ষীপুরের জিরিঘাটে বন্দুকের নলের সামনে অপহরণ, পরে গুলিবিদ্ধ দেহ উদ্ধার

কিন্তু কিছুদূর এগোতেই একদল সশস্ত্র যুবক তাকে ঘিরে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বন্দুক তাক করে ভয় দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাটি ঘটে দিনের আলো ফোটার আগেই যেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা থাকার কথা, সেখানে এমন দুঃসাহসিক অপহরণ কার্যত আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছে। কয়েক ঘণ্টা পর, বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বাঘখাল সড়কের পাশে উদ্ধার হয় লুকুর নিথর দেহ। শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন এবং গুলির দাগ স্পষ্ট ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। তাদের দাবি, লুকুকে শুধু গুলি করাই হয়নি,  তার আগে তাকে মারধর করা হয়েছে নির্মমভাবে। হাত-পা ভাঙা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তাকে। এই বিবরণ যদি সত্যি হয়, তাহলে এটি শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ড নয়, বরং পরিকল্পিত অত্যাচারের একটি জঘন্য দৃষ্টান্ত। ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় জিরিঘাট পুলিশ।

মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। যদিও দিনশেষে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি, মঙ্গলবার তা সম্পন্ন হওয়ার কথা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃতদেহে চারটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, পয়েন্ট .২২ বোরের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে চারজনকে আটক করা হয়েছে এবং একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জিরিঘাট থানার ওসি রানা কুমার নাথ জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে, এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই নির্মম হত্যার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, পুরনো জমি সংক্রান্ত বিবাদের জেরেই এই ঘটনা ঘটতে পারে। আবার অন্য একটি মহল আরও উদ্বেগজনক একটি দিক তুলে ধরেছে, জিরিঘাটে ক্রমবর্ধমান মাদক চক্রের প্রভাব। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় ড্রাগস ব্যবসার বিস্তার ঘটেছে, এবং এর সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়ে উঠেছে।

সেই অর্থের দাপটে এখন তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছে। অনেকেই মনে করছেন, লুকু মিয়া হয়তো এই বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন, যার ফলেই তাকে টার্গেট করা হয়ে থাকতে পারে। লুকু মিয়া লস্করের পরিবার এখন শোকস্তব্ধ। পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী এবং চার পুত্র, যাদের মধ্যে দুজন বাইরে কর্মরত। ঘটনার সময় পরিবারের সদস্যরা সামনে থাকলেও বন্দুকধারীদের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পাননি।

এই চিত্র একদিকে যেমন আতঙ্কের, তেমনি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতারও প্রতিফলন। অবাক করার বিষয়, এত বড় ঘটনার পরও সংবাদ লেখা পর্যন্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব হয়নি। এটি কি ভয়, না কি অন্য কোনো চাপ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

স্থানীয়দের বক্তব্য, জিরিঘাটে এর আগে এমন ভয়ঙ্কর ঘটনার নজির নেই। ফলে এই ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, এই ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় অপরাধ ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে, গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে। যদি সত্যিই মাদক চক্র বা অর্থবলীয় দাপট এই ঘটনার পেছনে থাকে, তাহলে তা শুধুমাত্র একটি অপরাধ নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত। প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি স্তম্ভে দাঁড়িয়ে, প্রথমত, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নির্ভুলভাবে উদ্ঘাটন করা, দ্বিতীয়ত, ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা, এবং তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সাধারণ মানুষের মনে ভেঙে পড়া নিরাপত্তার আস্থা পুনর্গঠন করা।

লুকু মিয়া লস্করের মৃত্যু যেন কেবল একটি সংখ্যা বা পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে এই দাবি আজ জিরিঘাটবাসীর সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারিত। তাঁদের প্রত্যাশা, এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সত্য সামনে আসবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে, প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপই পারে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে এবং এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে।

Related Posts

লক্ষীপুরে কংগ্রেসের ভরাডুবির নেপথ্যে প্রার্থী রহস্য!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ আসামের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে বিরোধী শিবিরের সক্রিয়তা, জোট রাজনীতি এবং শাসকবিরোধী হাওয়া যখন রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন বার্তা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী চিত্র ধরা পড়ে…

৪২ কোটি টাকার প্রকল্পে চার বছরে এক কিলোমিটারও নয়, সর্ষের মধ্যেই ভূত দেখছেন শিলচরবাসী

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ শিলচর শহরের জল নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান প্রাণরেখা রাঙ্গিরখালকে কেন্দ্র করে যে আশার আলো দেখানো হয়েছিল, আজ তা অনেকটাই অনিশ্চয়তার কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে। যে প্রকল্পকে শহরবাসীর…