বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ কাছাড় জেলার সোনাই রাজস্ব চক্র আধিকারিক কার্যালয়কে কেন্দ্র করে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে, যা কেবল একটি জমি-বিবাদের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ উঠেছে, আবেদনকারীকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে গোপনে জমির মাপজোখ বা জরিপ সম্পন্ন করা হচ্ছে, যেন কোনও অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে পুরো প্রক্রিয়া।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি একেবারেই ভুতুড়ে প্রশাসনিক কাণ্ড। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উত্তর মোহনপুরের বাসিন্দা এলাম উদ্দিন গত ১৬ মার্চ, ২০২৬ তারিখে জেলা শাসকের এনওসি শাখায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে পরগণা বনরাজের অন্তর্গত মৌজা বিদ্রোহীপার এলাকার ২য় রিং জরিপাধীন ২১ নম্বর পাট্টার ১৪ নম্বর দাগের একটি বিতর্কিত জমি।
বিবাদ মেটেনি, আবেদনকারীকে অন্ধকারে রেখে জমি বিক্রির তোড়জোড়
জানা গেছে, এই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাম উদ্দিন ও সাহিদুর রহমান মজুমদারের মধ্যে বিবাদ চলছিল। বিষয়টি LT Case No. 33/2025 হিসেবে সোনাই সার্কেল অফিসে বিচারাধীনও ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, মামলাটি বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে না জানিয়ে এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই গোপনে জমির মাপজোখ সম্পন্ন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবি, প্রশাসনের এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ শুধু আইনগত প্রক্রিয়াকেই লঙ্ঘন করছে না, বরং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করছে।
তাঁর আশঙ্কা, এইভাবে গোপনে জরিপ চালানোর ফলে প্রকৃত তথ্য বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় আইনি জটিলতার জন্ম দিতে পারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, প্রশাসনের এমন গোপনীয় ও প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। তাঁদের দাবি, পুরো ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে সকলের নজর জেলা প্রশাসনের দিকে এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা কী পদক্ষেপ নেয়। দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা হবে, নাকি এই ঘটনাও অন্যান্য অভিযোগের মতোই নথির স্তূপে চাপা পড়ে যাবে, সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
টেবিলের নিচে লেনদেনের অভিযোগে সরব ভুক্তভোগী
অভিযোগকারীর দাবি, পূর্বে সোনাই সার্কেল অফিসে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য কানুনগোর মাধ্যমে সরজমিন তদন্ত করে জমির সীমানা নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটছে, তা সেই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিপরীত। এলাম উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে জানানো হয়েছিল যে প্রয়োজনীয় নকশা বা রেকর্ড কপি কার্যালয়ের কাছে নেই, ফলে তদন্তে দেরি হচ্ছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, তিনি গোপন সূত্রে জানতে পারেন যে, বিবাদ মীমাংসা না করেই অপর পক্ষ সাহিদুর রহমান মজুমদার ওই জমি বিক্রির জন্য এনওসি সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ আরও গুরুতর। বলা হচ্ছে, কার্যালয়ের একাংশের মদতে আবেদনকারীকে না জানিয়েই সরজমিন তদন্ত বা জমির মাপজোখের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে,যা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত এবং আইনসঙ্গত প্রক্রিয়ার সরাসরি লঙ্ঘন। সাধারণত এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নোটিশ দিয়ে উপস্থিত রেখে মাপজোখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখানে সেই প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে গোপনে কাজ সারার অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কিত জমিতে এনওসি প্রক্রিয়া নিয়ে চাঞ্চল্য, কার্যালয়ের ভূমিকায় উঠছে গুরুতর প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। প্রশাসনের অজান্তে কি এমন কাজ সম্ভব? নাকি কারও ছত্রছায়ায় নিয়ম-কানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে এই গোপন খেলা? টেবিলের নিচে লেনদেনের ইঙ্গিতও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যা গোটা ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এলাম উদ্দিন তার আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, বিবাদপূর্ণ জমির নিষ্পত্তি না করেই যদি বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে।
দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অথচ এত গুরুতর সম্ভাবনার পরেও প্রশাসনের নিরবতা রহস্য আরও ঘনীভূত করছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত জমি-বিবাদের ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যায়ের আশায় বছরের পর বছর দপ্তরের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, সেখানে গোপনে কাজ সেরে ফেলার অভিযোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।
সোনাই অঞ্চলে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সম্প্রতি পরিচালিত জমির মাপজোখ প্রক্রিয়ায় একাধিক অসংগতি ও অনিয়ম চোখে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী। তাঁদের অভিযোগ, এই ভুতুড়ে মাপজোখ এর আড়ালে প্রকৃত তথ্য গোপন করে কিছু অসাধু স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা চলছে।
ভুক্তভোগী পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মাপজোখের নামে এমন কিছু পরিমাপ দেখানো হয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কোনওভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে বহু মানুষ তাঁদের নিজস্ব জমি নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জমি সংক্রান্ত জটিলতা আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষকে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই বিতর্কিত মাপজোখ প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
দ্রুত তদন্ত শুরু করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি এই ঘটনাও অন্যান্য অভিযোগের মতোই প্রশাসনিক ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে যাবে, সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সোনাইবাসী। সোনাইয়ের এই তথাকথিত ভুতুড়ে মাপজোখ এখন আর শুধুমাত্র একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি ক্রমশ সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের দাবিতে এক প্রতীকী লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ ও স্বচ্ছ পদক্ষেপই পারে এই পরিস্থিতির সমাধান করতে এবং মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে।


