বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ২৫ এপ্রিলঃ বরাক উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম শিলচর-জয়ন্তীয়া সড়ক আজ এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি যতটা উচ্চকিত, বাস্তব চিত্র ততটাই ভঙ্গুর, বিপজ্জনক এবং উদ্বেগজনক। বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সড়কের বর্তমান অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা নিঃসন্দেহে এক চলমান মৃত্যুফাঁদ বলেই আখ্যা দেওয়া যায়। সড়কের বিভিন্ন অংশজুড়ে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা অনেক জায়গায় এতটাই গভীর যে যানবাহন চলাচল কার্যত বিপর্যস্ত।
কোথাও হাঁটুসমান জল জমে থাকছে, আবার কোথাও কাদামাটিতে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে রাস্তার পৃষ্ঠ। সামান্য বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ফলে প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করা হাজার হাজার মানুষকে চরম ঝুঁকি ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই সড়ক এখন এক কঠিন পরীক্ষার ময়দান।
অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ক্রমশ বাড়ছে, কারণ প্রতিদিন সন্তানদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মজীবী মানুষের কাছেও এই সড়ক অনিশ্চয়তার প্রতীক, সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানো যেন ভাগ্যের উপর নির্ভর করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই সড়কের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম গাফিলতি চলছে। মাঝে মধ্যে সংস্কারের নামে কাজ শুরু হলেও তা টেকসই নয় বলেই দাবি তাঁদের। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই কাজ ভেঙে পড়ে, ফলে জনসাধারণের দুর্ভোগ আরও বাড়ে। সরকারি তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের দাবি, অবিলম্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের স্থায়ী ও মানসম্পন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
দুই বছরে মাত্র ২ কিমি সংস্কার, বর্ষার আগেই চরম দুর্ভোগে জনজীবন, প্রতিদিন প্রাণ হাতে নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের
শুধু সাময়িক মেরামত নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন। প্রশাসনের দায়িত্বশীল মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল। উন্নয়নের ঢাকঢোলের মাঝে শিলচর-জয়ন্তীয়া সড়কের এই করুণ চিত্র যেন এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে, প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবের এই ব্যবধান আর কতদিন?
গত এক বছর ধরে একাধিক গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে এই সড়কের দুরবস্থা তুলে ধরা হলেও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অভিযোগ, খবর প্রকাশের পর সাময়িক কিছু দেখানো কাজ হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। সংবাদমাধ্যমে বারবার বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে, কিন্তু কাজের গতি দেখে মনে হয় যেন ইচ্ছে করেই সময় নষ্ট করা হচ্ছে ক্ষোভের সুরে বলেন স্থানীয় এক বাসিন্দা।
বহুল প্রচারিত আসাম মালা প্রকল্প এর আওতায় এই সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হলেও বাস্তব অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রায় দুই বছরে মাত্র ২ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার হওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও সদিচ্ছা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কাজের তদারকির অভাব স্পষ্ট। ফলে যেখানে কাজ শেষ হয়েছে, সেখানেও অল্প সময়ের মধ্যেই পুনরায় গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে।

শিলচর-জয়ন্তীয়া সড়ক কেবল একটি সাধারণ যোগাযোগ পথ নয়, এটি বরাক উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জন্য এক অপরিহার্য জীবনরেখা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি এই সড়কের উপর নির্ভরশীল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যা এর গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির বর্তমান বেহাল অবস্থা এখন গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সড়কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে ধলছড়া বিএসএফ ক্যাম্প, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি রয়েছে রন্ধন গ্যাস বটলিং প্ল্যান্ট, যেখান থেকে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এছাড়াও শিলচর-হাফলং সড়কের সংযোগস্থল হিসেবে এই পথের কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। একাধিক রেলওয়ে স্টেশন এবং কুম্ভিরগ্রাম বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রধান পথ হিসেবেও এই সড়কের বিকল্প কার্যত নেই।
এমন একটি সড়কের করুণ অবস্থা শুধুমাত্র সাধারণ যাতায়াতকে বিঘ্নিত করছে না, বরং জরুরি পরিষেবা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা কাঠামোকেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অ্যাম্বুল্যান্স, অগ্নিনির্বাপক বাহন বা নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত চলাচল এই পরিস্থিতিতে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম অবহেলা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই সড়কের প্রতি প্রশাসনের উদাসীনতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলছে। এমন একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ক্ষেত্রে অবিলম্বে স্থায়ী ও মানসম্পন্ন সংস্কার জরুরি। শুধু অস্থায়ী মেরামত দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
শুকনো মৌসুমে ধুলোর দাপট, আর বর্ষায় কাদা ও জলাবদ্ধতা এই দুইয়ের মাঝখানে পড়ে সাধারণ মানুষ যেন চরম ভোগান্তির শিকার। ইতিমধ্যেই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে নিয়মিত, তবে বড় কোনো দুর্ঘটনা যে কেবল সময়ের অপেক্ষা এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।
প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহারকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্কের আবহ, যার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে অভিভাবকদের কথায়। এক অভিভাবকের আক্ষেপভরা অভিযোগ, প্রতিদিন বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর সময় ভয় লাগে, কখন কী হয়ে যায়, তা বলা যায় না। এই একবাক্যেই ধরা পড়ছে সড়কের ভয়াবহ বাস্তবতা। যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছনোর পথই হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিয়েই উঠছে বড় প্রশ্ন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রশাসনের চরম গাফিলতি রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখন আর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই বলেই মত তাঁদের। প্রতিদিনের দুর্ভোগ, দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয়দের দাবি একেবারেই স্পষ্ট ও যুক্তিযুক্ত। তাঁদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে, অবিলম্বে সড়কের পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত সংস্কার, নির্মাণ কাজে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা, এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ।
তাঁদের সতর্কবার্তাও স্পষ্ট, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে যে কোনো বড় দুর্ঘটনার দায় প্রশাসন এড়াতে পারবে না। সব মিলিয়ে, শিলচর-জয়ন্তীয়া সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু একটি রাস্তার সমস্যা নয়, এটি প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা, উন্নয়নের বাস্তব চিত্র এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার এক বড় পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে।
উন্নয়নের নামে প্রকল্প ঘোষণা, কাজের ঢিমেতালে অগ্রগতি, এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চরম অব্যবস্থা সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়ন কি শুধুই পরিসংখ্যানের খাতায় সীমাবদ্ধ? বরাক উপত্যকার মানুষ এখন আর আশ্বাস নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান। কারণ, এই সড়ক শুধু পথ নয়, এটি হাজারো মানুষের প্রতিদিনের জীবন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এখন দেখার, এই দাবি, দাওয়ার প্রেক্ষিতে প্রশাসন কত দ্রুত ও কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।


