৮৪ লক্ষ নাম যুক্ত হলেও আগের তুলনায় বাদ প্রায় ২ কোটি ভোটার, প্রশ্নে এসআইআর প্রক্রিয়া

নির্বাচন কমিশনের এই দাবি প্রশাসনিক দৃঢ়তার ইঙ্গিত দিলেও, বাস্তব চিত্রে উঠে আসা সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া, আবার একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন ভোটারের অন্তর্ভুক্তি, এই দ্বৈত প্রবণতা নির্বাচনের আগে ভোটের অঙ্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ভোটার তালিকার এই পুনর্গঠন শুধুমাত্র একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা নির্বাচনী কৌশল, জনমত এবং রাজনৈতিক ফলাফলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই পরিবর্তন কাদের পক্ষে যাবে, আর কাদের জন্য তৈরি করবে নতুন চ্যালেঞ্জ? সব মিলিয়ে, উত্তরপ্রদেশের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা এখন শুধু একটি পরিসংখ্যানের নথি নয়; এটি হয়ে উঠেছে আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক আবহের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, ভোটার তালিকার এই পরিবর্তনই নির্ধারণ করতে পারে ক্ষমতার চূড়ান্ত সমীকরণ।

১০ এপ্রিল প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৪ হাজার ৭৯২। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ কোটি ৩০ লক্ষেরও বেশি (প্রায় ৫৪ শতাংশ), মহিলা ভোটার ৬ কোটির কিছু বেশি (৪৫.৪৬ শতাংশ) এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪,২০৬ জন। তবে এই চূড়ান্ত তালিকার সঙ্গে ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত খসড়া তালিকার তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৮৪ লক্ষ ২৮ হাজার ৭৬৭ জন নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

খসড়া তালিকায় মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৫৫ লক্ষ ৫৬ হাজার ২৫ জন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৃদ্ধি ঘটেছে তরুণ ভোটারদের ক্ষেত্রে। ১৮-১৯ বছর বয়সি ভোটারের সংখ্যা খসড়ায় ছিল মাত্র ৩ লক্ষ ৩৩ হাজার ৯৮১, যা চূড়ান্ত তালিকায় বেড়ে হয়েছে ১৭ লক্ষ ৬৩ হাজার ৩৬০ অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ বৃদ্ধি। যদিও মোট ভোটারের হিসেবে তা এখনও মাত্র ১.৩২ শতাংশ।

চূড়ান্ত তালিকার সবচেয়ে আলোচিত দিকটি হল, এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর আগের তালিকার তুলনায় মোট ভোটার প্রায় ২ কোটি কমে যাওয়া। আগে যেখানে ভোটার সংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৪৪ লক্ষের বেশি, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে ১৩.৩৯ কোটিতে। এছাড়া, ভোটার তালিকায় ১ কোটি ৪ লক্ষ আনম্যাপড ভোটারের অস্তিত্বও প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রায় ৩ কোটি ২৬ লক্ষ ভোটারকে নোটিস পাঠানো হয়। সেই নোটিসপ্রাপ্তদের মধ্যেই প্রায় ৮৪ লক্ষ ভোটারের নাম শেষ পর্যন্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এই বিশাল সংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে শুরু থেকেই উদ্বেগে ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। খসড়া তালিকায় প্রায় ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার খবর সামনে আসতেই তিনি সরাসরি বলেন, যাদের নাম বাদ পড়ছে, তারাও বিজেপির ভোটার। এরপরই দলীয় সাংসদ ও কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। সূত্রের খবর, অন্তত দেড় কোটি ভোটারের নাম নতুন করে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮৪ লক্ষ নাম যুক্ত হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

আগামী বছরের শুরুতেই উত্তরপ্রদেশে ৪০৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দেশের সবচেয়ে বড় এই রাজ্যে ভোটার তালিকার এমন বড়সড় পরিবর্তন যে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া দুটি বিষয়ই নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতার দাবি করলেও বিরোধী শিবির ইতিমধ্যেই এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। আনম্যাপড”ভোটারদের সংখ্যা, বিপুল পরিমাণ নাম বাদ পড়া এবং পুনরায় অন্তর্ভুক্তির হার, সব মিলিয়ে এই ভোটার তালিকা আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সব মিলিয়ে, উত্তরপ্রদেশের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা শুধু একটি প্রশাসনিক নথি নয়, এটি আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক তাপমাত্রা কতটা বাড়তে চলেছে, তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে।

Related Posts

বিজেপির সঙ্গে তিন দশকের সম্পর্ক ছিন্ন, ময়দানে জয়ন্ত দাস

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ অবশেষে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে বিজেপি ছাড়লেন দলের প্রবীণ নেতা তথা দিছপুৰ কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের টিকিট প্রত্যাশী জয়ন্ত কুমার দাস। টিকিট না পাওয়ার ক্ষোভে দলত্যাগ করে তিনি…

এবারের নির্বাচনে বিজেপি নয়, লড়াই কংগ্রেস বনাম কংগ্রেসের দুই শিবিরের লড়াই, গৌরব গগৈয়ের বিস্ফোরক মন্তব্যে উত্তপ্ত অসম রাজনীতি

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ২২ মার্চঃ অসমে বিধানসভা নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই আবহে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ চরমে পৌঁছেছে। এমন পরিস্থিতিতে অসম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি সাংসদ গৌরব গগৈ…