বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১২ এপ্রিলঃ নির্বাচনী প্রচারের উত্তাপে ব্যস্ত পুলিশ ও জেলা প্রশাসন, সেই সুযোগে শিলচর শহর এবং শহরতলীর আনাচে কানাচে জুড়ে আইপিএল বুকি চক্রের জাঁকিয়ে বসেছে এধরণের অনৈতিক ব্যবসা। বিপথে যুবসমাজ, উদ্বেগে শহরবাসী, বিধানসভা নির্বাচনের উত্তাপে যখন সরগরম গোটা কাছাড় জেলা, তখনই নীরবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এক গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) কেন্দ্রিক জুয়ার রমরমা কারবার।
নির্বাচনী ব্যস্ততার ফাঁক গলে এই অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যকলাপ যেভাবে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সচেতন মহলেও বাড়ছে গভীর উদ্বেগ। নির্বাচন মানেই প্রশাসনের সর্বোচ্চ সতর্কতা। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করা, এইসব গুরুদায়িত্ব সামলাতে গিয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন কার্যত দিনরাত এক করে কাজ করছে। কিন্তু ঠিক এই অতিরিক্ত ব্যস্ততাকেই যেন হাতিয়ার করে তুলেছে এক শ্রেণির অসাধু চক্র। অভিযোগ উঠছে, প্রশাসনের নজর যখন মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে কেন্দ্রীভূত, তখন সেই সুযোগে শিলচর শহরসহ গোটা কাছাড় জেলায় পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে আইপিএল বেটিং চক্র।
আইপিএল কেন্দ্রিক অবৈধ বেটিংয়ে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন, বিপথে যুবসমাজ, উদ্বেগে শহরবাসী
শুধু শহরের কেন্দ্রস্থল নয়, বরং ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা, আবাসিক পাড়া এমনকি শহরতলির নিরিবিলি অঞ্চলেও গোপনে গড়ে উঠছে এই জুয়ার আসর। স্থানীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন এই বেটিং নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে। মোবাইল ফোন, বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপ, এনক্রিপ্টেড হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং গোপন কলের মাধ্যমে প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে লক্ষাধিক থেকে কোটি টাকার বাজি ধরা হচ্ছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই সংগঠিত ও পরিকল্পিত যে সাধারণ মানুষের চোখে পড়ার আগেই লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ অভিযোগ করে বলছেন, এই ধরনের অবৈধ জুয়া শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আরও নানা অসামাজিক কার্যকলাপ মানি লন্ডারিং, চোরাচালান, এমনকি অপরাধ জগতের সঙ্গে যোগসাজশের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তরুণ সমাজ বিশেষ করে এর সহজ টার্গেট হয়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর সামাজিক সংকেত বহন করছে।
সহজে অর্থলাভের প্রলোভনের ফাঁদে যুব সমাজ, পরিবারে বাড়ছে অশান্তি ও ঋণের বোঝা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
আইপিএল শুরু হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে জাঁকিয়ে শুরু হয়েছে বুকিদের ব্যবসা। শরৎপল্লী, কনকপুর, সোনাইরোড, লিংক রোড, বিলপার, তারাপুর, ইটখোলা, মেহেরপুর সহ আরও বেশ কিছু এলাকায় অবাধে চলছে আইপিএল জুয়ার রমরমা ব্যবসা। রাতবিরেতে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার স্বপ্নে কিছু লোক তো জেনে বুঝে গাঁটের কড়ি খোয়াচ্ছেন। আবার নতুন হাতে ওঠা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অসংখ্য ছাত্র ও এদের ফাঁদে পা দিচ্ছে। এদের অনেকেই আবার বিশাল লোকশানের মুখে পড়ে সম্মান বাঁচাতে আত্মহননের চেষ্টা করছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শিলচর শহরে এ মুহূর্তে আইপিএল বুকিদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন গোপাল দেবনাথ, সহদেব পাল, রোহিত চক্রবর্তী, মান্না দাস (টিটন), নবীন জৈন, সৌরভ রায়, সুমন সাহা, প্রীতম দাস, সঞ্জয় ঘোষ, রূপম সাহা। এদের সঙ্গে রয়েছেন বিশাল, পোচন, কুটুস, পার্থ, টটো অয়ন পাল, গৌতম রায়, ঝলক দেব, বিভু পাল, মিঠু রায়, টিপু আচার্য, অলক, অরুপ ভট্টাচার্য, পিনাক সাহা, বিশ্বজিৎ দাস, বিধুল বণিক, বাপ্টু রায়, প্রভু বণিক, গোপাল দেব নাথ সহ অনেকেই। খবর, পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের পকেটে পুড়ে তারা ওই অসাধু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসনের এই ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে কীভাবে এত বড় একটি নেটওয়ার্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল? কোথাও কি নজরদারির ঘাটতি রয়েছে? নাকি প্রভাবশালী কোনও গোষ্ঠীর ছত্রছায়ায় এই কারবার চলছে? যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও সামনে আসেনি, তবে স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছে, নির্বাচন যেমন গণতন্ত্রের উৎসব, তেমনি আইনশৃঙ্খলার শৃঙ্খলাও বজায় রাখা সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভোটের ব্যস্ততার মাঝেও প্রশাসনের উচিত এই ধরনের অবৈধ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সমান তৎপরতা দেখানো। অন্যথায়, গণতন্ত্রের উৎসবের আড়ালে বেড়ে ওঠা এই অন্ধকার দিক একসময় সমাজের বৃহত্তর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ করে প্রতিটি বল, প্রতিটি ওভার, কোন ব্যাটসম্যান কত রান করবেন, কে উইকেট নেবেন, এমনকি ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়েও চলছে অবৈধ বাজির হিসাব। আইপিএল এর জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে বুকি চক্র সাধারণ মানুষের ক্রিকেটের আবেগকে সরাসরি অর্থের খেলায় পরিণত করেছে। দ্রুত লাভের লোভে বহু যুবক এবং ছাত্রছাত্রীও এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ, যা সামাজিকভাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
শহরবাসীর একাংশের প্রশ্ন, নির্বাচন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, প্রশাসনের নজরদারির বাইরে কীভাবে এত বড় অবৈধ কার্যকলাপ চলতে পারে? শিলচরের মতো সংবেদনশীল শহরে যখন পুলিশ বাহিনী নির্বাচনী দায়িত্বে মোতায়েন, তখন বুকিরা কি পরিকল্পিতভাবে এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছে? নাকি প্রশাসনিক ব্যস্ততার ফাঁকফোকরকে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করছে এই চক্র?
শিলচর শহরের এক সচেতন নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এটি সামাজিক অবক্ষয়েরও বড় ইঙ্গিত। দ্রুত টাকা আয়ের প্রলোভনে সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা এই জুয়ার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। বহু পরিবারে আর্থিক অস্থিরতা, ঋণের বোঝা এবং পারিবারিক অশান্তির পেছনে এই ধরনের অবৈধ বেটিংয়ের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। আরও বড় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ওপর কড়া নজরদারি, আচরণবিধি প্রয়োগ, মিছিল-মিটিংয়ের অনুমতি সবকিছুতেই যেখানে প্রশাসনের কড়াকড়ি ছিল, সেখানে শহরের বুকে আইপিএল জুয়ার আসর যদি অবাধে চলে, তবে তা নিঃসন্দেহে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তোলে। সচেতন মহলের দাবি, নির্বাচনী দায়িত্বের পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বুকি চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
না হলে গণতন্ত্রের উৎসবের আবহে অপরাধচক্রের এই বাড়বাড়ন্ত ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। শিলচরের সাধারণ মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছেন, ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শহরকে কি জুয়ার অন্ধকার চক্রের হাত থেকেও রক্ষা করা হবে? এখন দেখার, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কঠোরভাবে এই বেআইনি জুয়ার কারবারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কারণ, শুধু নির্বাচন নয়, একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্বও যে প্রশাসনের কাঁধেই বর্তায়, তা ভুলে গেলে চলবে না।


