বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১২ এপ্রিলঃ পয়লা বৈশাখের আগমনী সুরে মুখর শিলচর শহর। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে চৈত্র রিডাকশন সেলের রমরমা বাজার। শহরের প্রায় প্রতিটি বিপণি, শোরুম ও অস্থায়ী দোকানে চলছে আকর্ষণীয় ছাড়ের অফার, যা স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের টেনে আনছে দলে দলে। তবে এবারের চিত্র যেন আগের সব বছরের তুলনায় ভিন্ন। ছাড়ের মোহে শুধুমাত্র শহরবাসীই নয়, আশেপাশের গ্রামাঞ্চল থেকেও হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন শিলচরে।
ফলে সকাল থেকেই শহরের প্রধান প্রধান বাজার এলাকা পরিণত হচ্ছে জনসমুদ্রে। বিশেষ করে প্রেমতলা পয়েন্ট, দেবদূত পয়েন্ট এবং শিলং পট্টি এই গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে দিনের অধিকাংশ সময়ই দেখা যাচ্ছে তীব্র যানজট। গাড়ির লম্বা সারি কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত গড়িয়ে যাচ্ছে। হর্নের শব্দ, মানুষের ভিড় আর যানবাহনের বিশৃঙ্খল চলাচল সব মিলিয়ে শহরের স্বাভাবিক ছন্দ যেন ভেঙে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। জরুরি কাজে বের হওয়া ব্যক্তিরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না, স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রীদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এমনকি পথচারীদের জন্যও রাস্তায় চলাচল হয়ে উঠেছে দুঃসাধ্য। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও, ক্রমবর্ধমান জনসমাগমের সামনে তা কার্যত অপ্রতুল হয়ে পড়ছে। ফলে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি শহরবাসীর মনে বাড়ছে উদ্বেগও। সব মিলিয়ে বলা যায়, পয়লা বৈশাখের কেনাকাটার উন্মাদনা শিলচরে একদিকে যেমন ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, অন্যদিকে তা শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় এনে দিচ্ছে বড়সড় চ্যালেঞ্জ।
পয়লা বৈশাখের আগে বাজারে উপচে পড়া ভিড়, অপরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থার অভাবে বিপর্যস্ত নিত্যদিনের জীবন
চৈত্র সেলের জোয়ারকে কেন্দ্র করে শিলচর শহরে যে অস্বাভাবিক জনসমাগমের সৃষ্টি হয়েছে, তা কার্যত নগ্ন করে দিয়েছে শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতাকে। উৎসবের কেনাকাটার এই উন্মাদনা এখন যেন এক বড়সড় নগর-সংকটে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠছে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ও পূর্ব প্রস্তুতির অভাবেই এই পরিস্থিতির জন্ম। যদিও শহরের প্রধান বাজার এলাকাগুলিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তবুও বাস্তবে তা যে একেবারেই অপ্রতুল তা প্রতিদিনের যানজটের চিত্রই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
বিশেষ করে অফিসে আসা ও বাড়ি ফেরার ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। রাস্তায় নেমে পড়ছে অসংখ্য গাড়ি ও মানুষ, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে শহরের গতিবিধি। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, অফিসগামী মানুষ, এমনকি জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া সাধারণ নাগরিক সকলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন দীর্ঘ যানজটে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, একাধিক ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত এই যানজটে আটকে পড়ার অভিযোগ সামনে আসছে। জীবন-মরণের প্রশ্নে সময়ের সঙ্গে লড়াই করা রোগীদের জন্য এই পরিস্থিতি যে কতটা বিপজ্জনক, তা সহজেই অনুমেয়। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, একটি পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা কি এতটাই দুর্বল যে, একটি মৌসুমি সেলই শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অচল করে দিতে পারে?
উৎসবের আনন্দ যেন নাগরিক দুর্ভোগে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। চৈত্র সেলের ভিড়কে ঘিরে শিলচর শহরের বর্তমান পরিস্থিতি যেন দুই বিপরীত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। একদিকে উৎসবমুখর কেনাকাটায় ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি, অন্যদিকে নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই বিপুল জনসমাগমকে স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানাচ্ছেন। তাদের বক্তব্য, সারা বছরের মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। চৈত্র সেলের এই বাড়তি বিক্রি অনেকের জন্যই আর্থিক স্বস্তি এনে দেয়, নতুন বছরের আগে ব্যবসায়ে গতি ফেরায়। তবে এই চিত্রের বিপরীতে উঠে আসছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
তাদের প্রশ্ন, ব্যবসার উন্নতির নামে কি একটি শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে? প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে ভোগান্তি সহ্য করা কি নাগরিকদের নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে? গাড়িচালক থেকে পথচারী সবাই এখন একবাক্যে দাবি তুলছেন, অবিলম্বে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে অস্থায়ী পার্কিং ব্যবস্থার প্রবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে একমুখী যান চলাচল চালু করা, এবং অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি বাজার এলাকায় যানবাহন প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মতো পদক্ষেপও বিবেচনা করা যেতে পারে। এখনই যদি সময়োপযোগী উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে এই উৎসবমুখর কেনাকাটা শহরের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং এক বড়সড় অভিশাপে পরিণত হতে পারে।
তাই প্রশাসনের দ্রুত, সুপরিকল্পিত ও কার্যকর হস্তক্ষেপই পারে এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে এনে শহরের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে দিতে। সব মিলিয়ে, শিলচরের এই পরিস্থিতি শুধু একটি মৌসুমি সমস্যাই নয়, বরং নগর পরিকল্পনার বড়সড় ঘাটতির প্রতিচ্ছবি। প্রশাসন যদি এখনই সজাগ না হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হতে পারে শহরবাসীকে। এখন দেখার, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।


