বরাকবাণী ডিজিটাল শ্রীভূমি ৮ এপ্রিলঃ অসমের নির্বাচনী আবহ ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, আর সেই উত্তাপের আঁচ পড়ছে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে। এই প্রেক্ষাপটে শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দির বাজারিছড়ায় অনুষ্ঠিত বিজেপির বিজয় সংকল্প সভা যেন শুধুমাত্র একটি জনসভা নয়, বরং শক্তি প্রদর্শনের এক বৃহৎ রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়। বৃহৎ জনসমাগম, দলীয় পতাকায় রঙিন পরিবেশ এবং কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে ভরপুর এই সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেন। তাঁর ভাষণে স্পষ্টভাবে উঠে আসে অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ, যা দীর্ঘদিন ধরেই অসমের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু। তিনি দাবি করেন, সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ করা অত্যন্ত জরুরি, এবং এই বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
পাথারকান্দিতে বিজেপির ‘মাস্টারস্ট্রোক’সভা, কড়া বার্তায় অমিত শাহ

এর পাশাপাশি, উন্নয়নকেও তিনি তাঁর ভাষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ উদ্যোগে অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা উল্লেখ করে তিনি জনসাধারণের সামনে ভবিষ্যতের আরও উন্নয়নের রূপরেখা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, উন্নয়নই হবে আগামী নির্বাচনের প্রধান হাতিয়ার। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি দলীয় কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রতিটি বুথে শক্তিশালী উপস্থিতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তাঁর কথায়, প্রতিটি ভোটই গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই ভোটকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব। এই সভা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থনের এক সুস্পষ্ট প্রদর্শন। নির্বাচনের আগে এই ধরনের বৃহৎ সমাবেশ যে ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।
পাথারকান্দিতে অমিত শাহের কড়া বার্তা, অনুপ্রবেশ রুখতে অ্যাকশন মোডে বিজেপি, উন্নয়নেই ভোটের বাজি
মঙ্গলবার আয়োজিত এই বিশাল জনসভায় দলীয় প্রার্থী তথা বর্তমান মন্ত্রী -এর সমর্থনে প্রচারে এসে অমিত শাহ সরাসরি জানিয়ে দেন, অসম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করার পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশছাড়া করা হবে। তাঁর এই মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়াকেও উপেক্ষা করে কয়েক সহস্রাধিক মানুষের উপস্থিতি কার্যত সভাকে রূপ দেয় জনসমুদ্রে। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, এই বিপুল ভিড়ই প্রমাণ করছে যে জনসমর্থনের পাল্লা কোন দিকে ভারী হচ্ছে। সভাস্থল জুড়ে বিজয় সংকল্প এর স্লোগান, দলীয় পতাকার ঢেউ এবং কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে তৈরি হয় এক বিদ্যুৎময় পরিবেশ।

পাথারকান্দিতে অমিত শাহের হুঙ্কার, অনুপ্রবেশে জিরো টলারেন্স বার্তা
সভামঞ্চে উঠে অমিত শাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, অসমে আবারও নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠিত হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যকে বন্যামুক্ত করার লক্ষ্যে নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হবে। উন্নয়নকেই বিজেপির মূল হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিজেপি সরকার ইতিমধ্যেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরকে একহাত নিয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন তিনি। অভিযোগ তোলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও কংগ্রেস কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়েই সীমাবদ্ধ থেকেছে, বাস্তবে উন্নয়ন হয়নি। এমনকি গান্ধী পরিবারকে কেন্দ্র করে দেশের সম্পদ লুঠের অভিযোগ তুলেও রাজনৈতিক আক্রমণ শানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিজয় সংকল্প সভা থেকে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দ্বৈত প্রতিশ্রুতি, বিরোধীদের কড়া আক্রমণ
ভাষণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল জাতীয় নিরাপত্তা ও অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গ। অমিত শাহ স্পষ্ট করে বলেন, সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষা এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর এই বক্তব্য নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
অনুপ্রবেশ রোধে কঠোর বার্তা, বরাকে উন্নয়নের ব্লুপ্রিন্ট তুলে ধরলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, বরাক উপত্যকার জন্য একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। কাছাড়ের খাসপুরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এসব প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে এলাকার অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার আশ্বাস দেন। একইসঙ্গে করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে শ্রীভূমি করার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আবেগঘন আবেদনও জানান স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে।

বিজয় সংকল্প সভায় বিরোধীদের বিরুদ্ধে তোপ, উন্নয়নের আশ্বাসে জোর বিজেপির
সভায় ধর্মীয় আবহও তৈরি হয়, যখন অমিত শাহ মা কামাখ্যা ও প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিজেপির আদর্শ প্রতিশ্রুতি নয়, কাজই আমাদের পরিচয়। সভা শেষে প্রায় এক ঘণ্টার একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রার্থী কৃষ্ণেন্দু পালসহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা। সূত্রের খবর, শ্রীভূমি জেলা এবং সমগ্র বরাক উপত্যকায় বিজেপির আসন জয়ের লক্ষ্যে বিস্তারিত রণকৌশল নিয়েই এই বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই বৈঠক আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা অনেকটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।
বিরোধীদের তীব্র আক্রমণের পাশাপাশি কৌশলগত বৈঠকে নির্বাচনী রণনীতি চূড়ান্তের ইঙ্গিত
সব মিলিয়ে, পাথারকান্দির এই বিজয় সংকল্প সভা শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী জনসভা ছিল না—এটি ছিল বিজেপির শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি ভোটের আগে জনমত প্রভাবিত করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস। অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া অবস্থান, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ এই তিনকে হাতিয়ার করেই বিজেপি যে আসন্ন নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করতে চাইছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই সভা থেকেই। এখন দেখার বিষয়, এই বার্তা ভোটবাক্সে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ শেষ কথা বলবে গণতন্ত্রের রায়ই।


