স্বামী–স্ত্রীর কলহের জেরে ৬ মাসের কন্যা দান! সোনাইয়ে শিশুকে এফিডেভিটে তুলে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য

জানা গেছে, সোনাই পূর্বাঞ্চলের নতুন রামনগর চতুর্থ খণ্ড (গড়রকান্দী) এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন লস্করের সঙ্গে প্রায় আঠারো মাস আগে কচুদরম চতুর্থ খণ্ডের সিমি বেগম লস্করের বিয়ে হয়। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই বিয়ে সামাজিক প্রথা বা আনুষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী হয়নি। বিয়ের এক বছরের মাথায় তাদের ঘরে জন্ম নেয় একটি কন্যা সন্তান।

কিন্তু সন্তান জন্মের পর থেকেই স্বামী–স্ত্রীর সম্পর্কে ক্রমশ চরম অবনতি ঘটে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, ইকবাল হোসেন লস্কর নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আসক্ত ছিলেন। বিশেষ করে মাদক আসক্তির কারণে প্রায়ই বাড়িতে অশান্তি সৃষ্টি হত। এর জেরেই স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই কলহ লেগে থাকত। পরিস্থিতি যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন নিরুপায় হয়ে সিমি বেগম সোনাই থানায় স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে আলোচনায় বসায় বলে জানা যায়। স্থানীয় কয়েকজন মুরব্বিও সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পরই নাকি উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বড় আইনি প্রশ্ন। অনেকেই জানতে চাইছেন, থানায় বসে কি আদৌ বিবাহ বিচ্ছেদ সম্ভব?

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোর চর্চা শুরু হয়েছে এলাকাজুড়ে। অভিযোগ উঠেছে, স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক বিরোধ মেটাতে সোনাই থানায় বসেই বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, কিছুদিনের মধ্যেই সেই দম্পতির নবজাতক কন্যা সন্তানকে একটি লিখিত এফিডেভিটের মাধ্যমে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ঘটনাটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইন মহলেও শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও প্রশ্ন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিবাহ বিচ্ছেদ কোনওভাবেই এমনভাবে সম্পন্ন হওয়ার বিষয় নয়। ভারতীয় আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ একটি সম্পূর্ণ আদালতনির্ভর প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট আইনি ধাপ, নোটিশ জারি, উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, শুনানি এবং শেষে বিচারকের রায় এই সমস্ত ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই বিবাহ বিচ্ছেদ আইনি ভাবে কার্যকর হয়। ফলে থানায় বসে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলেই মত আইনজ্ঞদের।

এই ঘটনার ক্ষেত্রে আরও এক বিস্ময়কর তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, বিবাহ বিচ্ছেদের পর নবজাতক কন্যা সন্তানটি ছোট হওয়ায় আপাতত তাকে মায়ের কাছেই রাখা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পরই সিমি বেগম নামে ওই মহিলা একটি লিখিত এফিডেভিটের মাধ্যমে একই এলাকার বাসিন্দা সারিমুল হক লস্করের স্ত্রী হাছিনা বেগম লস্করের হাতে শিশুটিকে তুলে দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই লিখিত নথি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

কারণ অভিযোগ অনুযায়ী, সেই কাগজে সন্তানের পিতার কোনও স্বাক্ষর নেই। শুধু তাই নয়, সেখানে বৈধ সাক্ষীর উপস্থিতিরও উল্লেখ নেই এবং আদালতের অনুমোদনের কোনও প্রমাণও পাওয়া যায়নি। অথচ ওই ঘোষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে যে নবজাতক শিশুটিকে অন্য পরিবারের কাছে সমঝে দেওয়া হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও শিশুকে অন্য পরিবারের কাছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। আদালতের অনুমোদন, শিশু সুরক্ষা সংস্থার তত্ত্বাবধান, বৈধ দত্তক গ্রহণের নথিপত্র এবং শিশুর কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য সরকারি যাচাইএই সমস্ত ধাপ সম্পন্ন না হলে এমন সিদ্ধান্ত আইনসম্মত বলে গণ্য হয় না।

ফলে শুধু একটি এফিডেভিটের মাধ্যমে নবজাতক শিশুকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি কতটা বৈধ, তা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। বিষয়টি সামনে আসার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একটি নবজাতক শিশুর ভবিষ্যৎ ও অধিকারকে কেন্দ্র করে এমন সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর যথাযথ আইনি তদন্ত হওয়া জরুরি।

সমগ্র ঘটনাকে ঘিরে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সোনাই থানায় বসে বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত এবং পরে একটি এফিডেভিটের মাধ্যমে শিশুকে অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি কি আদৌ আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন তাকিয়ে রয়েছে গোটা এলাকা।

ঘটনার খবর পেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিশুটির পিতা ইকবাল হোসেন লস্কর। সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি দাবি করেন, আমাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিচারক মণ্ডলী শুধু আপাতত সন্তানের দায়িত্ব মায়ের হাতে দিয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, আমার সন্তানকে অন্য কারও কাছে বিক্রি বা দিয়ে দেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি বিচারক মণ্ডলীর কাছে আবেদন জানাবেন এবং প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেবেন। তার দাবি, কন্যা সন্তানকে যেন দ্রুত তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেকেই বলছেন, সন্তান কি কোনও বস্তু, যাকে ইচ্ছেমতো জন্ম দিয়ে আবার ইচ্ছেমতো অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায়? আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় আইনে সন্তানকে এভাবে দান করার কোনও বিধান নেই। কোনও শিশুকে অন্য পরিবারের কাছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। দত্তক গ্রহণের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন, শিশু কল্যাণ কমিটির তত্ত্বাবধান এবং সরকারি নিয়ম মেনে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।

শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, নবজাতক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ভবিষ্যৎ, নিরাপত্তা এবং কল্যাণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই ক্ষেত্রে কোনও লিখিত স্মরণলিপি বা ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে শিশুকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া আইনি দৃষ্টিতে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। সব মিলিয়ে স্বামী–স্ত্রীর পারিবারিক দ্বন্দ্ব, থানায় বসে বিবাহ বিচ্ছেদের অভিযোগ এবং তার পরপরই নবজাতক কন্যা সন্তানকে অন্য পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি, এই তিনটি ঘটনাই এখন সোনাই অঞ্চলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনায় প্রশাসন এবং শিশু সুরক্ষা সংস্থার অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। কারণ বিষয়টি শুধু একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি নিষ্পাপ শিশুর ভবিষ্যৎ এবং আইনের মর্যাদার প্রশ্ন। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় প্রশাসন, পুলিশ কিংবা শিশু কল্যাণ সংস্থা কোনও তদন্ত শুরু করে কি না। কারণ একটি নবজাতক শিশুর ভাগ্য যদি এভাবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে, তবে তা সমাজ এবং আইনের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

Related Posts

প্রথম বৃষ্টিতেই বাত্তি গোল, পাঁচগ্রাম জিএসএস-এর পিটিআর ট্রিপ করায় বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিপর্যয়, বিদ্যুৎ পরিষেবার বেহাল চিত্রে ক্ষোভে ফুঁসছে কালাইন–কাটিগড়া

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১৫ মার্চঃ মৌসুমের প্রথম ঝড়ো বৃষ্টি নামতেই আবারও সামনে এল বিদ্যুৎ পরিষেবার দুর্বল অবকাঠামোর চিত্র। শনিবার সন্ধ্যায় প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও বজ্রপাতের জেরে পাঁচগ্রাম জিএসএস এর…

মন্ত্রী কৌশিক রায়ের বিধানসভাতেই গ্যাস সংকটে নাজেহাল মানুষ

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১৫ মার্চঃ লক্ষীপুরে হঠাৎ করেই রন্ধন গ্যাসকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিরতা ও দুর্ভোগের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে লক্ষীপুর শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় রান্নার…