বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১৩ মার্চঃ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার কড়া ভূ-মাফিয়া বিরোধী অভিযানের পরও কি থামেনি জমি দখলের দৌরাত্ম্য? সরকারি কড়া বার্তা সত্ত্বেও কাছাড় জেলায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ভূমি মাফিয়াদের তৎপরতা—এমনই অভিযোগকে ঘিরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে শিলচর শহরতলীর দক্ষিণ কৃষ্ণপুর এলাকায়। পৈতৃক জমি জবরদখলের অভিযোগ এনে শিলচর সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন এলাকার বাসিন্দা আফিয়া খানম মজুমদার। অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর এবং তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন প্রায় ৩০ কাটা জমি দখল করার উদ্দেশ্যে একদল লোক সংঘবদ্ধভাবে সেখানে হামলা চালায় এবং তাঁদের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকিও দেয়।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী আফিয়া খানম মজুমদার ও তাঁর স্বামীর বক্তব্য অনুযায়ী, শিলচর–আইজল সড়ক সংলগ্ন দক্ষিণ কৃষ্ণপুর এলাকায় তাঁদের বহু বছরের পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সেই জমি তাঁদের পরিবারের দখলেই ছিল। কিন্তু গত ৩ মার্চ হঠাৎ একটি ফোন কল তাঁদের পরিবারের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে। ফোনে জানানো হয়, তাঁদের জমিতে কিছু লোকজন মাটি ফেলে জোর করে দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে।
খবর পেয়েই আফিয়া খানম মজুমদার তাঁর ছোট বোন এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে তাঁরা যে দৃশ্য দেখেন, তা তাঁদের হতবাক করে দেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আফিয়ার কাকার ঘরের ভাই ইকবাল হুসেন মজুমদারসহ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি দল জমিতে ট্রাকভর্তি মাটি ফেলে দখল নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানাতেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আফিয়ার ছোট বোন যখন এই কাজের প্রতিবাদ করেন, তখন অভিযুক্তদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তরা ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আফিয়ার ছোট বোনের উপর চড়াও হয়। তাঁকে চুল ধরে টেনে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং জমি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, আফিয়া খানম মজুমদারের অভিযোগ, তাঁর পুরো পরিবারকে প্রকাশ্যে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের সংখ্যাধিক্য এবং পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতির কারণে তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত প্রাণের ভয়ে সেখান থেকে সরে যেতে বাধ্য হন বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর স্থানীয় কিছু প্রবীণ ব্যক্তির কাছে বিষয়টি মীমাংসার জন্য নিয়ে যাওয়া হলেও তাতে কোনো ফল মেলেনি বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার। দীর্ঘদিনের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে শেষমেশ আইনের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আফিয়া খানম মজুমদার। তিনি শিলচর সদর থানায় চারজনকে অভিযুক্ত করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে আলতাফ হুসেন লষ্কর, নিয়াম উদ্দিন মজুমদার, ইকবাল হুসেন লষ্কর এবং কবির উদ্দিন লষ্করের।
এই ঘটনাকে ঘিরে দক্ষিণ কৃষ্ণপুর এলাকায় ইতিমধ্যেই তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের মতে, রাজ্যে যখন সরকার ভূ-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, তখনও যদি এমনভাবে প্রকাশ্যে জমি দখলের চেষ্টা হয়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে রাজ্য সরকার একাধিকবার ভূ-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং বহু অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও বিভিন্ন সময়ে ঘোষণা করেছেন যে, ভূমি দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না। তবে দক্ষিণ কৃষ্ণপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, মাঠ পর্যায়ে কি সেই কঠোর বার্তা যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে? নাকি প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে জমি দখলচক্র?
এদিকে ভুক্তভোগী আফিয়া খানম মজুমদার ও তাঁর পরিবার প্রশাসনের কাছে দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, জমি দখলের চেষ্টা এবং প্রাণনাশের হুমকির ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন ঘটনার শিকার না হন। বর্তমানে এই ঘটনায় শিলচর সদর থানার পুলিশ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে দক্ষিণ কৃষ্ণপুর এলাকার বাসিন্দাদের।


