বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১৩ মার্চঃ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে অসমে শাসক দল বিজেপি এবার প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একেবারে নতুন কৌশল অবলম্বন করতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণ, গোষ্ঠীসমর্থন বা কেবলমাত্র দলীয় সুপারিশের ওপর নির্ভর না করে এবার দলের শীর্ষ নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা জনমত সমীক্ষা, সাংগঠনিক মূল্যায়ন এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে বরাক উপত্যকার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে একাধিক পর্যায়ে জনমত সমীক্ষা চালাচ্ছে। এই সমীক্ষায় শুধুমাত্র দলের জনপ্রিয়তা নয়, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, জনসংযোগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—সবকিছুকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে বহু ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিন ধরে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশায় থাকা নেতাদের অবস্থান এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

জনমত সমীক্ষায় পিছিয়ে বর্তমান বিধায়ক; রাজদীপ–দিলীপের নাম গুরুত্ব হারাচ্ছে, অভ্রজিতকে ঘিরে বিতর্ক
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপি এবার উইনেবিলিটি ফ্যাক্টরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ যিনি বাস্তবে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাকেই প্রার্থী করার দিকেই ঝুঁকছে দল। এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন স্তরে গোপন সমীক্ষা, বুথভিত্তিক রিপোর্ট এবং সাংগঠনিক ফিডব্যাক সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর ফলে অনেক পুরোনো মুখের পাশাপাশি নতুন কিছু সম্ভাব্য নামও উঠে আসছে আলোচনায়।
বিজেপি মনোনয়নে ‘ক্লিন ইমেজ’ সমীকরণ, শিলচরে উজ্জ্বল বিবেক পোদ্দার
বরাক উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রেও এই নতুন কৌশলের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলীয় অন্দরে ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। একাধিক নেতার নাম ঘুরে বেড়ালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই হবে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। ফলে স্থানীয় স্তরে লবিং বা গোষ্ঠী রাজনীতির প্রভাব এবার অনেকটাই কমে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শিলচর কেন্দ্রটি ঐতিহ্যগতভাবেই বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি আসন। এই আসনের ফলাফল প্রায়শই পুরো উপত্যকার রাজনৈতিক বাতাবরণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই কারণেই বিজেপি এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। দলীয় কৌশল নির্ধারণে এখানকার সামাজিক সমীকরণ, ভোটারদের মনোভাব এবং স্থানীয় ইস্যুগুলোকেও বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিজেপির এই নতুন প্রার্থী নির্বাচন কৌশলকে ঘিরে বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরেও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, যদি সত্যিই জনমত সমীক্ষা এবং গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়, তাহলে তা রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে অসমে বিজেপির প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, তা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিলচর বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে আগামী দিনে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এখন সকলের নজর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও ‘নির্বাচনী কৌশল নির্ধারক’ প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে একাধিক দফায় জনমত সমীক্ষা করিয়েছে বিজেপি। সেই সমীক্ষায় উঠে এসেছে বেশ কিছু অস্বস্তিকর তথ্য। কিছু বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, প্রশাসনিক অরাজকতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ নাকি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে জরিপে। ফলে ওইসব বিধায়কদের ভূমিকা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যথেষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
দলীয় মহলের একাংশের মতে, কিছু জনপ্রতিনিধির আচরণ ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে দলের ভাবমূর্তি যে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে দিল্লি পর্যন্ত উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলেই এবার প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, রাজ্য বিজেপির তরফে দিল্লিতে পাঠানো সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্যানেল তালিকায় কিছু বর্তমান বিধায়কের নাম থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় সেইসব নাম কার্যত গুরুত্ব হারিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শিলচর কেন্দ্রকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে বিজেপি অসম বাণিজ্য সেলের আহ্বায়ক বিবেক পোদ্দারের নাম উল্লেখযোগ্যভাবে উঠে এসেছে। সংগঠনের ভেতরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সামাজিক কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এবং দলের প্রতি আনুগত্য এই সব দিক বিবেচনায় তাঁকে সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খবর।
দলীয় সূত্রে দাবি, সমাজসেবা ও বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে বিবেক পোদ্দার দীর্ঘদিন ধরে শিলচর ও আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ তৈরি করেছেন। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও তাঁর সুনাম রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব এবং ‘ক্লিন ইমেজ’-এর বার্তা দিতে বিজেপি যদি শিলচরে নতুন মুখের ওপর ভরসা করে, তা হলে বিবেক পোদ্দারই হতে পারেন অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী।
অন্যদিকে বর্তমান বিধায়ক দীপায়ন চক্রবর্তীকে ঘিরে দলীয় স্তরে তীব্র অসন্তোষের খবর ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। সূত্রের দাবি, তাঁর কাজকর্ম ও রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে সংগঠনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমে ছিল। সাম্প্রতিক জরিপেও তাঁর জনপ্রিয়তা আশানুরূপ নয় বলে উঠে এসেছে। ফলে প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম কার্যত আলোচনার বাইরে চলে গেছে বলে রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন।
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে এসেছে। দলের নীতিনির্ধারকরা নাকি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অতীতে সাংসদ বা বিধায়ক হিসেবে যাঁদের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছিল, তাঁদের আবারও প্রার্থী করা হবে না। সেই কারণেই শিলচর কেন্দ্রের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় প্রাক্তন সাংসদ রাজদীপ রায়ের নাম আর গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে জানা গেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন মহলে যে ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে, তা দলের কাছে অজানা নয়।
প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপকুমার পালের নামও একসময় আলোচনায় থাকলেও এখন সেই সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ। বিধায়ক থাকাকালীন তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য ও দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে প্রকাশ্য মতবিরোধের ঘটনা এখনও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের স্মৃতিতে তাজা বলে জানা গেছে। তাছাড়া গত বিধানসভা নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শাণিত করার ঘটনাও দল সহজে ভুলতে পারেনি। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপোষণের অভিযোগও রয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। ফলে তাঁকে পুনরায় প্রার্থী করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ নেতারা আগ্রহী নন বলেই খবর।
প্রাক্তন পুরসদস্য অভ্রজিৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট চালানোর গুচ্ছ অভিযোগ!
এই সমীকরণের মাঝেই সামনে এসেছে আরেকটি বিতর্ক। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে যে, যদি দীপায়ন চক্রবর্তী নিজে মনোনয়ন না পান, তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তথা প্রাক্তন পুরসদস্য অভ্রজিৎ চক্রবর্তীকে প্রার্থী করার চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু সেই কৌশল সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে দলীয় মহল ইঙ্গিত দিয়েছে।
কারণ, অভ্রজিৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পুরসভায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর কাজকর্মের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পাশাপাশি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর জেলা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এমনকি পাথর কোয়ারি, বনজ ও খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত অবৈধ ব্যবসা এবং সিন্ডিকেট রাজের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে, এমন অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরছে। এই সব অভিযোগের কারণে তাঁকে প্রার্থী করার বিষয়ে দলীয় নেতৃত্ব যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে শিলচর কেন্দ্রের প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি যদি সত্যিই নতুন মুখ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীদের ওপর জোর দেয়, তবে শিলচর কেন্দ্র থেকে বিবেক পোদ্দারের নামই শেষ পর্যন্ত সামনে আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে দিল্লির শীর্ষ নেতৃত্বই নেবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ফলে এখন নজর একটাই বিজেপি শেষ পর্যন্ত শিলচরে পুরনো সমীকরণ ভেঙে নতুন অধ্যায় শুরু করে কি না। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচনে এই কেন্দ্রের লড়াইয়ের চেহারা ঠিক কেমন হবে।


