বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১৩ মার্চঃ পবিত্র রমজান মাসে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে জলপান করতে দেখা গেল এক মুসলিম জনপ্রতিনিধিকে আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই কাছাড় জেলার সোনাই বিধানসভা এলাকায় শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা, বিতর্ক ও রাজনৈতিক কটাক্ষের ঝড়। ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সোনাই বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক করিম উদ্দিন বড়ভুইয়া (সাজু)। একটি সরকারি অনুষ্ঠানের মঞ্চে বসেই তাকে জল পান করতে দেখা যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়তেই গোটা বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে জনমুখে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
ঘটনাটি ঘটে কাছাড় জেলার সোনাই এলাকায় আয়োজিত ‘মুখ্যমন্ত্রী মহিলা উদ্যমিতা অভিযান’ প্রকল্পের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে। সরকারি উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী কৌশিক রাই, পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিধায়ক করিম উদ্দিন বড়ভুইয়াসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

অনুষ্ঠান চলাকালীন মঞ্চে বসে থাকা অবস্থায় বিধায়ককে বোতল থেকে জল পান করতে দেখা যায়, যা উপস্থিত কিছু মানুষের নজরে আসে এবং পরে মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই সোনাইসহ গোটা কাছাড় জেলায় বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় জোর চর্চা।
রমজান মাসে ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজাদার মুসলমানদের জন্য পানাহার থেকে বিরত থাকা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় বিধান। ফলে একজন মুসলিম জনপ্রতিনিধির জনসমক্ষে দিনের বেলায় জলপানের দৃশ্য সামনে আসতেই অনেকের মধ্যেই বিস্ময় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় বিধান ও সামাজিক সংবেদনশীলতার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে শুরু করেছে।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়তেই নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, রমজানের সময় এমন একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে একজন মুসলিম বিধায়কের এই আচরণ কতটা যুক্তিসঙ্গত। আবার অনেকে এটিকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, কারও শারীরিক অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত কারণে রোজা রাখা সম্ভব নাও হতে পারে, তাই বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়।
এদিকে বিধায়কের ঘনিষ্ঠ কিছু সমর্থক সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেছেন, করিম উদ্দিন বড়ভুইয়া সম্ভবত শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন বলেই জল পান করেছিলেন। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনুষ্ঠান, প্রচণ্ড গরম এবং শারীরিক ক্লান্তির কারণে তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতেই তাকে জল পান করতে হয়। তবে এই দাবির পক্ষে এখনো পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য বা স্পষ্ট ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।
এই প্রসঙ্গে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা মন্ত্রী কৌশিক রাই-ও এক বক্তব্যে ইঙ্গিত দেন যে বিধায়ক শারীরিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না। তিনি জানান, করিম উদ্দিন বড়ভুইয়া নাকি প্রথমে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। পরে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেই তাকে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয়। মন্ত্রীর এই মন্তব্যকে অনেকেই বিধায়কের অসুস্থতার দাবির পক্ষে একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শিবির বিষয়টিকে হাতিয়ার করে সমালোচনার সুর চড়াতে শুরু করেছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, সম্প্রতি অসম গণ পরিষদ-এ যোগদানের পর থেকেই করিম উদ্দিন বড়ভুইয়াকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসছে। তাদের মতে, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের পর জনমত ও সমর্থন ধরে রাখার ক্ষেত্রে এমন ঘটনাগুলো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজ্যের রাজনীতিতেও বিষয়টি নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে ট্যাগ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অসমের রাজনীতিতে ধর্ম ও পরিচয়ভিত্তিক আলোচনার মাত্রা বাড়ছে, যার প্রভাব এ ধরনের ঘটনাকেও আরও বিতর্কিত করে তুলছে। যদিও এই সব মন্তব্য মূলত রাজনৈতিক মতামতের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে সব বিতর্কের মধ্যেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখনো পর্যন্ত এই ঘটনার বিষয়ে বিধায়ক করিম উদ্দিন বড়ভুইয়া নিজে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেননি। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ বা তার ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন, বিতর্কের অবসান ঘটাতে হলে বিধায়কের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক মাধ্যমের যুগে ছোট একটি ঘটনাও মুহূর্তের মধ্যে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার সঙ্গে যুক্ত কোনো বিষয় হলে তা আরও দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সোনাইয়ের এই ঘটনাও তারই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একাংশের মত, একজন জনপ্রতিনিধির প্রতিটি আচরণ জনসমক্ষে নজরবন্দি থাকে। তাই জনজীবনে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন সংবেদনশীল বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। আবার অনেকে মনে করছেন, ঘটনাটিকে অযথা রাজনৈতিক রং দেওয়াও সমানভাবে অনুচিত।
সব মিলিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপ ঘিরে সোনাইয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা আপাতত থামার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রকৃত কারণ কী অসুস্থতা, অনিচ্ছাকৃত ভুল, নাকি অন্য কোনো পরিস্থিতি তা জানতে এখন সংশ্লিষ্ট পক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় মানুষ। রমজানের পবিত্র মাসে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি আগামী দিনে সোনাইয়ের রাজনৈতিক সমীকরণে কোনও প্রভাব ফেলবে কি না, সেই প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।


