বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১২ মার্চঃ রামকৃষ্ণ নগর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত আনিপুর নয়াটিলা জিপির বিষ্ণুপুর এলাকার ছনটিলা গ্রাম। কাগজে-কলমে এখানে পৌঁছে গেছে সরকারের বহুল প্রচারিত হর ঘর জল, হর ঘর নল প্রকল্প। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বসানো হয়েছে পাইপলাইন ও নলকূপ। কিন্তু বাস্তব চিত্র যেন একেবারেই ভিন্ন নল আছে, কিন্তু নেই জল। তৃষ্ণায় কাতর গ্রামবাসী আজ বাধ্য হয়ে প্রশ্ন তুলছেন,
তবে কি এই প্রকল্প শুধুই প্রচারের জন্য? গ্রামের মানুষ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই এখানে তীব্র পানীয় জলের সংকট বিরাজ করছে। বিশেষ করে চলতি বছরের প্রচণ্ড দাবদাহে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। খাল-বিল, নদী-নালা প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক জলাধারগুলোও আর কোনো ভরসা জোগাতে পারছে না। ফলে গ্রামের মানুষ এখন কার্যত জল সংকটের এক চরম মানবিক সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, গ্রামের খুব কাছেই শনবিল ও কালীবাড়ি এলাকায় জনস্বাস্থ্য কারিগরি (পিএইচই) দপ্তরের দুটি জল প্রকল্প থাকলেও সেই প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। বহুবার প্রশাসন, বিভাগীয় কর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে সমস্যার কথা জানানো হলেও আজ পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ গ্রামবাসীদের।
এই জল সংকট যে কতটা চরম ও হৃদয়বিদারক অবস্থায় পৌঁছেছে, তার এক করুণ উদাহরণ সম্প্রতি সামনে এসেছে। কয়েকদিন আগে ছনটিলা গ্রামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা চেয়েছিলেন ধর্মীয় নিয়ম মেনে শেষবারের মতো মৃতদেহ স্নান করিয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে। কিন্তু বাড়িতে তখন এক বালতি জলও ছিল না।
মৃত ব্যক্তির অসহায় বিধবা স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, স্বামীর শেষকৃত্যের সময় গোসল করানোর মতো এক বালতি জলও তাদের ঘরে ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে জল সংগ্রহ করে স্বামীর শেষ স্নান করাতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, এর থেকে লজ্জা আর কষ্টের কী হতে পারে? জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু স্বামীর শেষকৃত্যের সময় এমন অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ভাবিনি।
এই ঘটনার পর থেকেই গোটা গ্রাম জুড়ে ক্ষোভ ও হতাশা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। গ্রামের আরেক প্রবীণ মহিলা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আমরা জনপ্রতিনিধিদের বাবার মতো ডাকি, কাকু বলে ডাকি। কতবার বলেছি, জল নেই, খুব কষ্টে আছি। কিন্তু কেউ আমাদের কথা শোনেনি। এখন শুধু চাই, মরার আগে অন্তত এক ফোঁটা জল খেয়ে যেন মরতে পারি।
গ্রামবাসীদের অভিযোগ, সরকারের বহু কোটি টাকার জল জীবন মিশন প্রকল্পের আওতায় গ্রামে পাইপলাইন বসানো হলেও সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা কার্যত শূন্য। অনেক বাড়িতে নল বসানো হয়েছে, কিন্তু মাসের পর মাস সেখানে এক ফোঁটা জলও আসে না। ফলে গ্রামবাসীদের কেউ কেউ দূরের জলাশয় বা অন্য গ্রামে গিয়ে জল সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে প্রতিদিনই নিত্য ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী ও বৃদ্ধরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কোটি টাকার প্রকল্প থাকলেও যদি সাধারণ মানুষ পানীয় জলের মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হন, তবে সেই প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বড় প্রশ্ন উঠে যায়। গ্রামবাসীদের অভিযোগ আরও, বিষয়টি নিয়ে বহুবার প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মাঝে মধ্যে কিছু কর্মী এসে পরিদর্শনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। এখন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গ্রামবাসীরা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হলে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উন্নয়নের ঢেউয়ের কথা বলা হচ্ছে, তখন ছনটিলা গ্রামের মতো এলাকায় এক ফোঁটা পানীয় জলের জন্য মানুষের হাহাকার নিঃসন্দেহে প্রশাসনের জন্য এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।
শুধু প্রকল্প ঘোষণা বা কোটি টাকার বরাদ্দ নয়, প্রয়োজন বাস্তবায়নের সঠিক নজরদারি এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতা। নইলে হর ঘর জল, হর ঘর নল স্লোগান কেবল পোস্টার আর বিজ্ঞাপনের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর বাস্তবে ছনটিলা গ্রামের মতো অসংখ্য মানুষ প্রতিদিনই জল সংকটের করুণ বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে যাবে।


