কাটাখাল নদীর করাল গ্রাসে সিংহপুর, ভাঙনে তলিয়ে যাচ্ছে শতাধিক বাড়ি

কেউ হারিয়েছেন বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ঘর, কেউ আবার হারিয়েছেন কৃষিজমি ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। একের পর এক বাড়ি নদীর গর্ভে তলিয়ে যাওয়ায় বহু পরিবার এখন কার্যত গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। ছোট ছোট শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং মহিলাদের নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন ভাঙনপীড়িত পরিবারগুলো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বরাক নদীর ভাঙন এই এলাকায় নতুন কোনো সমস্যা নয়। প্রতি বছর বর্ষা এলেই নদীর ভাঙন বাড়ে এবং একের পর এক বসতভিটা নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের তরফে স্থায়ী কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বছর ঘুরলেই একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে গ্রামবাসীদের। গ্রামবাসীরা জানান, বহুবার প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সাময়িকভাবে কিছু বালির বস্তা ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। নদীর স্রোতের কাছে সেসব উদ্যোগ খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নদীর ধার ঘেঁষে থাকা আরও অনেক বাড়ি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো সময় সেগুলোও নদীগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

ফলে গোটা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি, অবিলম্বে স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যেসব পরিবার ইতিমধ্যেই ঘরবাড়ি হারিয়েছেন, তাদের জন্য দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে। অন্যথায় এই এলাকার মানুষকে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত কয়েক বছর ধরেই বরাক নদীর ভাঙন এই অঞ্চলে ধীরে ধীরে মারাত্মক আকার ধারণ করলেও প্রশাসনের তরফে তা রোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে এবারের বর্ষার আগমনের আগেই আতঙ্কের প্রহর গুনছেন কাটাখাল সিংহপুর গ্রামের মানুষ। গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে নদীর তীর ভেঙে পড়ছে প্রতিনিয়ত।

নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, বসতভিটা, গাছপালা যা কিছু ছিল গ্রামবাসীর জীবিকা ও অস্তিত্বের ভিত্তি। গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, কিছুদিন আগেই অন্তত শতাধিক বসতবাড়ি নদীর গর্ভে তলিয়ে গেছে। বহু পরিবার এক নিমেষে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। নদীর ধারে বসবাসকারী অনেক পরিবার ইতিমধ্যেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

তবে যারা এখনো গ্রাম ছেড়ে যেতে পারেননি, তারা প্রতিটি মুহূর্ত কাটাচ্ছেন চরম আতঙ্কের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে গ্রামবাসীরা জানান, বিষয়টি নিয়ে বারবার স্থানীয় বিধায়ক নিজাম উদ্দিন চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের অবগত করা হলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাঁদের অভিযোগ, এই সমস্যার প্রতি জনপ্রতিনিধিদের উদাসীনতা এবং প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

অবশেষে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের আশায় সংবাদমাধ্যমের দ্বারস্থ হয়েছেন ভুক্তভোগীরা। সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে তারা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং জলসম্পদ মন্ত্রী পিযুষ হাজারিকার কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন জানান। তাদের বক্তব্য, যদি এখনই নদীভাঙন রোধে শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে অচিরেই ভাঙন আরও মারাত্মক রূপ নেবে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, বর্তমান ভাঙনের গতিপথ অনুযায়ী খুব শীঘ্রই বিপদের মুখে পড়তে পারে শিলচর–বদরপুর ৩৭ নম্বর জাতীয় সড়ক। পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ রেললাইনও। নদীর ভাঙন যদি এভাবেই অব্যাহত থাকে, তবে শুধু গ্রামবাসীর বসতভিটাই নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যার প্রভাব পড়বে গোটা বরাক উপত্যকার উপর। গ্রামবাসীদের মতে, এখনই যদি রাজ্য সরকারের জলসম্পদ বিভাগ সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং জরুরি ভিত্তিতে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ বা নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প হাতে নেয়, তবে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব।

অন্যথায় আগামী বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এদিন সংবাদমাধ্যমের সামনে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী গোবিন্দ রাজকুমার, অঞ্জলি সিনহা, জয় কিশোরী সিংহ, আসু, মিতালী সিনহা, প্রতিমা সিনহা, অভিষেক সিনহা, প্রিয়াঙ্কা সিনহা, লক্ষ্মী সিনহা, রিতা সিনহা, অনিতা রাজকুমারী, সান্তনা সিনহা, লক্ষী সিনহা সহ আরও অনেকে। তারা একসুরে দাবি জানান মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গ্রামবাসীদের বক্তব্য স্পষ্ট, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক উদ্যোগ থাকলে এই ভাঙন রোধ করা অসম্ভব নয়। তাই সময় থাকতে রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের দ্রুত হস্তক্ষেপই এখন কাটাখাল সিংহপুরবাসীর একমাত্র আশা। সব মিলিয়ে বরাক নদীর ভাঙন আবারও হাইলাকান্দির কাটাখাল সিংহপুর গ্রামে এক গভীর মানবিক সংকট তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে এগিয়ে আসে।

Related Posts

শ্রীভূমি জেলার মালুয়ায় বেপরোয়া ডাম্পারের চাকায় পিষ্ট স্কুটি আরোহী নিহত

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ মার্চঃ শ্রীভূমি জেলার মালুয়া জলালপুর এলাকায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন এক স্কুটি আরোহী। বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা একটি ডাম্পারের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়…

শিলচরে বিদ্যুৎ বিল সংশোধনের বিরোধিতায় সরব গ্রাহক সংগঠন

বরাকবাণী দৈনিক ডিজিটাল ডেস্ক, ১১ মার্চঃ কেন্দ্র সরকারের প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫-কে ‘চূড়ান্ত জনবিরোধী ও গ্রাহকবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের প্রতিনিধিত্বকারী সর্বভারতীয় সংগঠন অল…