বরাকের রাজনীতিতে আইসিইউতে কংগ্রেস, সোনাই যেন সেই রোগীর মেডিকেল রিপোর্ট !

রাজনৈতিক অভিধানে একে অনেকেই আখ্যা দিচ্ছেন আত্মঘাতী প্রতিবাদের নতুন সংস্করণ হিসেবে। বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে অনেক বিশ্লেষকই রসিকতার সুরে বলেন, এই অঞ্চলে কংগ্রেসের বর্তমান অবস্থা যেন আইসিইউতে ভর্তি এক রোগীর মতো। বাইরে থেকে সংগঠনকে যতটা সুসংগঠিত ও স্থির বলে মনে হয়, বাস্তবে ভেতরে ভেতরে ততটাই জমে উঠছিল ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

আর সোনাইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যেন সেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসুস্থতার এক প্রকাশ্য মেডিকেল রিপোর্ট। শনিবার সোনাই বাজার এলাকায় যা ঘটল, তা শুধু একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি নয় বরং দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের প্রকাশ্য বিস্ফোরণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের অনেকেই। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ অবশেষে রাস্তায় নেমে এসেছে, আর তার প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে কুশপুত্তলিকা দাহের মধ্য দিয়ে।

     কাছাড় জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র সোনাই। বরাক উপত্যকার রাজনীতিতে এই আসনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। অতীতে বহু রাজনৈতিক সমীকরণ এই কেন্দ্রকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে। ফলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল ও উত্তেজনা বেশি। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই কংগ্রেসের অন্দরমহলে অস্বস্তির সুর তীব্র হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

বিশেষ করে প্রার্থী ঘোষণাকে ঘিরে দলের ভিতরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত ক্ষোভে রূপ নিতে শুরু করে। তৃণমূল স্তরের অনেক কর্মীই শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিলেন, দলের উপরমহল তাদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রার্থী চাপিয়ে দিয়েছে। এই অভিযোগ ধীরে ধীরে সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষের আগুন জ্বালাতে থাকে। শেষপর্যন্ত সেই ক্ষোভই প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হলো সোনাই বাজারে। অনেকের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি কেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়, বরং বরাক উপত্যকায় কংগ্রেস সংগঠনের ভেতরে জমে থাকা গভীর অসন্তোষেরই প্রতিফলন।

শনিবার দুপুরের পর থেকেই সোনাই বাজার এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন ক্ষুব্ধ কর্মী ও সমর্থকরা। ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় বিক্ষোভ মিছিলে। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায় যখন বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী, আসামের অন্যতম মুখ, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা এবং সাংসদ এর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়।

দলবদল, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, টিকিট বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ এসব প্রায় প্রতিটি দলেরই পরিচিত বাস্তবতা। কিন্তু প্রকাশ্যে নিজের দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এতটা নাটকীয় প্রতিবাদ সত্যিই বিরল। ফলে সোনাইয়ের ঘটনাটি দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। এই বিক্ষোভের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক । সম্প্রতি তিনি বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে যোগদান করেছেন এবং সোনাই কেন্দ্র থেকে তাঁকেই প্রার্থী করা হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি দলের একাংশের তৃণমূল কর্মীরা।

স্থানীয় কর্মীদের অভিযোগ, যাঁরা বছরের পর বছর ধরে দলের পতাকা নিয়ে মাঠে কাজ করেছেন, তাঁদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। উপর থেকে প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই অভিযোগই এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে সংগঠনের ভেতরে। রাজনীতির অঙ্কটি আসলে খুব কঠিন নয়। একটি দলের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার তৃণমূল কর্মীদের ওপর। সেই কর্মীরাই যখন মনে করেন তাঁদের মতামতের কোনও মূল্য নেই, তখন সংগঠনের ভিত নড়ে যায়।

সোনাইয়ের ঘটনাটি যেন সেই বাস্তবতারই সরাসরি প্রমাণ। ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে আরেকটি তথ্য। প্রার্থী ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই সোনাইয়ের নয়জন মণ্ডল সভাপতি দলত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। একটি রাজনৈতিক দলের তৃণমূল কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরই হল এই মণ্ডল সংগঠন। যারা গ্রামে গ্রামে সংগঠন চালায়, ভোটের সময় বুথ সামলায়, কর্মীদের সক্রিয় রাখে তাঁরাই যখন একে একে সরে যেতে শুরু করেন, তখন সেটাকে আর সাধারণ অসন্তোষ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রাজনীতিতে বিরোধী দলকে আক্রমণ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সোনাইয়ের দৃশ্য যেন অন্য গল্প বলছে। এখানে কংগ্রেস যেন বিরোধী দলের ভূমিকাই নিজে পালন করছে, আর লক্ষ্যবস্তু তার নিজের নেতৃত্ব। একদিকে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। অন্যদিকে দলের ভেতরেই বিদ্রোহের আগুন জ্বলছে। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে কংগ্রেসকে এখন বাইরে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করার আগেই নিজের ঘরের আগুন নেভাতে হচ্ছে। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রার্থী পরিবর্তন না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।

অর্থাৎ সামনে কংগ্রেসের জন্য দ্বৈত সংকট। একদিকে বিদ্রোহী কর্মীদের ক্ষোভ সামলানো, অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি। সোনাইয়ের এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় বিক্ষোভ নয়। বরং বরাক উপত্যকায় কংগ্রেসের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি প্রতিচ্ছবি বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। একসময় বরাকের রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা দলটি এখন সংগঠনিক দুর্বলতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের সংকটে জর্জরিত। সোনাইয়ের ঘটনাটি সেই সমস্যাগুলোকেই যেন আরও স্পষ্ট করে সামনে এনে দিয়েছে।

সোনাই শহরের সচেতন মানুষের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যে দলে কর্মীরাই নেতাদের কুশপুত্তলিকা দাহ করে প্রতিবাদ করেন, সেই দলের সবচেয়ে বড় বিরোধী আর বাইরের কেউ নয়, দল নিজেই। এখন বড় প্রশ্ন একটাই, কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব কি দ্রুত এই ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারবে? নাকি সোনাইয়ের আগুন ধীরে ধীরে গোটা বরাক উপত্যকার সংগঠনকেই গ্রাস করবে? সোনাইয়ের রাস্তার সেই আগুন তাই শুধু কয়েকটি কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তা এখন বরাকের রাজনীতিতে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।

Related Posts

কাটিগড়ায় কমলাক্ষ ইস্যুতে গেরুয়া শিবিরে তোলপাড়, ক্ষোভে ফুটছে স্থানীয় বিজেপি শিবির

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কাটিগড়া বিধানসভা সমষ্টি। আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সমষ্টিতে বিজেপির সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনকে ঘিরে দলীয়…

অসম আর শুধু চায়ের রাজ্য নয়, গড়ে উঠছে বৃহৎ শিল্পকেন্দ্র : হিমন্ত

ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ অসম আর কেবল চা উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে পরিচিত নয়, এখন রাজ্য দ্রুত এক বহুমুখী শিল্পশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। এই মন্তব্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। সোমবার সামাজিক…