ওয়েবডেস্ক, বারাকবাণী, ৯ মার্চঃ বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও চর্চার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কাটিগড়া বিধানসভা সমষ্টি। আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই সমষ্টিতে বিজেপির সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনকে ঘিরে দলীয় অন্দরে যে মতভেদ ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল, তা এবার প্রকাশ্যেই সামনে চলে এল। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন সদ্য বিজেপিতে যোগদান করা বরাকের পরিচিত রাজনৈতিক মুখ কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ। বৃহস্পতিবার গুয়াহাটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগদান করার পর থেকেই তাকে ঘিরে কাটিগড়া বিজেপির অন্দরমহলে আলোচনা তীব্র হয়েছে। আর এই ইস্যুতেই সরব হয়ে উঠেছেন কাটিগড়ার প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক অমরচাঁদ জৈন।
সরাসরি নাম উল্লেখ করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তা ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অমরচাঁদ জৈনের স্পষ্ট বক্তব্য, আগামী ২০২৬ সালের নির্বাচনে যদি কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে কাটিগড়া থেকে বিজেপির প্রার্থী করা হয়, তাহলে এই আসনটি বিজেপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তার মতে, কাটিগড়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত না নিলে দলকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।

প্রাক্তন বিধায়কের প্রশ্ন, কাটিগড়া কি শুধুমাত্র ভোটের সময় বহিরাগত প্রার্থীদের প্রমোট করার জায়গা? তিনি ক্ষোভের সুরে বলেন, নির্বাচনের সময় অনেকেই এখানে এসে বাসিন্দা সেজে ওঠেন, স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয়তার বার্তা দেন, কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার পর আর তাদের দেখা মেলে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা এবং বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়েছে। নিজের বক্তব্যকে আরও জোরালো করতে তিনি অতীতের একাধিক উদাহরণ টেনে আনেন।
অমরচাঁদ জৈনের কথায়, ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে আইনজীবী অনিল চন্দ্র দে কাটিগড়ায় বাড়ি তৈরি করে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের বার্তা দিয়েছিলেন। পরে বিজেপির টিকিট পেয়ে নির্বাচনও লড়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাকে আর কাটিগড়ার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই ধরনের পরিস্থিতি নাকি তৈরি হয়েছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও।

তখন কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে কাটিগড়া থেকে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যেই এখানে বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেছিলেন বরাক উপত্যকার অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, একসময়ের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত গৌতম রায়। শেষ পর্যন্ত বিজেপির টিকিটও পেয়েছিলেন তিনি এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেন। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাকেও আর কাটিগড়ার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে দেখা যায়নি বলে দাবি করেন অমরচাঁদ জৈন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, এই ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার ফলে কাটিগড়ার সাধারণ মানুষের মনে বহিরাগত প্রার্থীদের নিয়ে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। তাই একই ভুল আবার করা হলে তার ফল ভুগতে হতে পারে বিজেপিকেই। অমরচাঁদ জৈনের দাবি, কাটিগড়ায় বিজেপির অধিকাংশ কর্মী-সমর্থকই এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার কথায়, দলের প্রায় নব্বই শতাংশ কর্মী-সমর্থক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না।
বহিরাগত প্রার্থী দিলে আসন হাতছাড়া হতে পারে সতর্কবার্তা প্রাক্তন বিধায়ক অমরচাঁদ জৈনের
কারণ তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় নেতাদের উপেক্ষা করে বাইরে থেকে কাউকে এনে প্রার্থী করা হলে তা কর্মীদের মনোবলে বড় ধাক্কা দেবে। তবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি এটাও বলেন, দল যদি স্থানীয় কোনও নেতাকে প্রার্থী করে, তাহলে তিনি নিঃশর্তভাবে সেই প্রার্থীর পাশে দাঁড়াবেন। বিজেপির একজন নিবেদিত কর্মী হিসেবে দলের স্বার্থকে তিনি সর্বাগ্রে রাখবেন বলেও জানান।
এই প্রসঙ্গে দলের সাংগঠনিক নিয়মের কথাও তুলে ধরেন তিনি। অমরচাঁদ জৈনের মতে, কোনও নেতাকে দলীয় টিকিট দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় সদস্যপদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার বক্তব্য, একজন নেতার অন্তত পাঁচ বছর ধরে দলের সঙ্গে থেকে সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত। এতে সংগঠনের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি এবং গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়।
কাটিগড়া কি শুধুই ভোটের সময় বহিরাগতদের প্রমোট করার জায়গা? প্রশ্ন প্রাক্তন বিধায়কের
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, অমরচাঁদ জৈনের এই প্রকাশ্য মন্তব্য কাটিগড়া বিজেপির অন্দরমহলে চলতে থাকা মতপার্থক্যের ইঙ্গিতকে আরও স্পষ্ট করে দিল। কারণ সাধারণত দলীয় প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে এমন প্রকাশ্য মন্তব্য খুব কমই সামনে আসে। বরাকের রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে সামনে রেখে বিজেপি কি কাটিগড়ায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে, নাকি স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিয়েই শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে দল?
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, কাটিগড়া সমষ্টিকে ঘিরে ততই তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক বাতাবরণ। কমলাক্ষ ইস্যু যে আগামী দিনে গেরুয়া শিবিরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে চলেছে, তা এখনই স্পষ্ট। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই দলীয় হাইকমান্ডের হাতেই। কিন্তু তার আগে কাটিগড়ার মাটিতে যে রাজনৈতিক তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।


