বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ শিলচর, বরাক উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র, আজ যেন এক গভীর নগর-সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। যে শহর একসময় শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক গুরুত্বে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই শহর আজ অবৈধ পার্কিং, রাস্তা দখল, ফুটপাত দখল, অননুমোদিত বাজার এবং ভয়াবহ যানজটের দুঃসহ যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত।
প্রশ্ন উঠছে, শহর কি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে, নাকি দখলদারদের হাতে? ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, শিলচরে আজ যেন আইনের শাসনের চেয়ে অঘোষিত দখলদার রাজনীতি বেশি শক্তিশালী। আর এই বাস্তবতায় কাঠগড়ায় উঠছে শাসক দলের স্থানীয় নেতা থেকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং পৌর নিগমের কর্তাব্যক্তিরা। অভিযোগ, নীরব মদত, উদাসীনতা, গাফিলতি এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়েই শহরজুড়ে গজিয়ে উঠেছে এই অবৈধতার সাম্রাজ্য।
রাস্তা, ফুটপাত, পার্কিং, যানজট সবকিছুই দখলে, নিয়ন্ত্রণহীনতায় বিপর্যস্ত শহর
শহরের প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত সড়ক এখন যানজটের ফাঁদ। জানিগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, নাজিরপট্টি, প্রেমতলা নিউমার্কেট, ফাটক বাজার, হাসপাতাল রোড, ক্লাব রোড, শিলংপট্টি যেদিকে তাকানো যায়, সেখানেই দখল, পার্কিং আর বিশৃঙ্খলা। যে রাস্তাগুলি মূলত দুই লেন চলাচলের উপযোগী, তার একাংশ দখল করে রয়েছে অবৈধ পার্কিং, আর বাকি অংশে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের চাপ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাস্তার ওপর বসে যাওয়া বাজার। ফলে রাস্তাই যেন পরিণত হয়েছে বাজার-কম-পার্কিং জোনে। নাগরিকদের প্রশ্ন, ট্রাফিক পুলিশ কোথায়? পৌর নিগম কি কেবল কর আদায়েই সীমাবদ্ধ? জেলা প্রশাসক কি এই চিত্র দেখেন না? একজন ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী বলেন, শহরের যানজট এখন প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, সম্পূর্ণ প্রশাসন সৃষ্ট সংকট। যাদের দায়িত্ব ব্যবস্থা নেওয়া, তারাই চুপ।
পুলিশ-প্রশাসন-পৌর নিগমের ব্যর্থতায় প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার মানুষ
সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ, যেসব এলাকায় প্রশাসনিক নজরদারি সবচেয়ে বেশি থাকার কথা, সেখানেই অবৈধ বাজারের রমরমা। ডিআইজি বাংলোর বিপরীতে, জেলা আয়ুক্তের সরকারি বাসভবনের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে প্রতিদিন বসছে বাজার, চলছে রাস্তা দখল করে পার্কিং। সদরঘাটে পুরসভা কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় একই চিত্র।
প্রশ্ন উঠছে, এত বড় দখলদারি যদি প্রশাসনের চোখের সামনে হয়, তবে তা কি নিছক অবহেলা, নাকি নীরব আশ্রয়? এক প্রবীণ নাগরিকের কটাক্ষ করে বলেন, ডিসির বাড়ির সামনে যদি বাজার বসে, তাহলে সাধারণ রাস্তার কী হাল হবে, তা বুঝতেই পারছেন। চার্চ রোডের চিত্র আজ প্রশাসনিক ব্যর্থতার জীবন্ত দলিল। একসময় হাতে গোনা কয়েকজন উপজাতি মহিলা বসতেন। এখন সেখানে প্রতিদিন পূর্ণাঙ্গ বাজার। মাছ, মাংস, শাকসব্জি, ফল সব কিছুর রমরমা।
যানজটে হাঁসফাঁস শহর, অননুমোদিত পার্কিংয়ের পেছনে কার ছত্রছায়া! জবাব চায় শিলচরের নাগরিক
শুধু তাই নয়, ওরিয়েন্টাল হাইস্কুল, শিলচর কলেজিয়েট স্কুল-সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং নিত্যযাত্রী প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার। সকালে বাজারের ভিড় আর যানজট এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে স্কুলে পৌঁছাতে শিক্ষার্থীদের নাজেহাল হতে হয়। অভিভাবকরা ব্যক্ত করে বলেন, প্রশাসন কি অপেক্ষা করছে বড় কোনও দুর্ঘটনার? সদরঘাটে পৌর নিগমের কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হয়ে জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন পেরিয়ে জানিগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে বিস্তৃত বাজার।
গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুলের সামনে প্রায় স্থায়ী বাজার গড়ে উঠেছে। একসময় যেসব এলাকায় কেবল ভোরবেলার অস্থায়ী বাজার বসত, আজ সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে মাছ, মাংস, শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বেচাকেনা। সাময়িক হাট এখন প্রায় স্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে। আর সেই বাজারকে কেন্দ্র করেই ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে শিলচরের নগর-পরিস্থিতি। দুর্গন্ধ, নোংরা পরিবেশ, বর্জ্যের স্তূপ, যানজট, স্বাস্থ্যঝুঁকি সব মিলিয়ে জনজীবন কার্যত অতিষ্ঠ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বাজারে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি কিংবা নগর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ন্যূনতম মানদণ্ডও মানা হচ্ছে না। উন্মুক্ত পরিবেশে মাছ-মাংস বিক্রি, অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা, নর্দমা আটকে যাওয়া এবং পচা গন্ধে আশপাশের বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে রাত পর্যন্ত এইসব এলাকায় পরিবেশ এমন হয়ে ওঠে, যেন নগর প্রশাসনের অস্তিত্বই নেই।

প্রশ্ন উঠছে, পৌর নিগম কি সব দেখেও না দেখার ভান করছে? নাকি এই দখলদারির পিছনে রয়েছে অদৃশ্য প্রশ্রয়? শুধু সদরঘাট বা চার্চ রোড নয়, এখন রাঙ্গিরখাড়ি, তারাপুর, সঞ্জয় মার্কেট, কলেজ রোড, সৎসঙ্গ আশ্রম রোড, চেংকুড়ি রোড, ইঅ্যান্ডডি কলোনি, এমনকি ন্যাশনাল হাইওয়ে পয়েন্ট শহরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাই অবৈধ বাজারের চাপে জর্জরিত।
রাঙ্গিরখাড়ি সঞ্জয় মার্কেট ঘিরে রাস্তার দুইপাশ জুড়ে প্রতিদিন বসছে পসরা। দেশবন্ধু রোড থেকে রাঙ্গিরখাড়ি পয়েন্টের প্রায় কাছাকাছি পর্যন্ত রাস্তা দখল করে চলছে কেনাবেচা। যান চলাচলের জন্য বরাদ্দ রাস্তা কার্যত বাজারের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছে।
তারাপুরেও একই ছবি। রাস্তার ধারে অস্থায়ী দোকান, ফুটপাত জুড়ে দখল, আর ক্রেতাদের অবাধ যানবাহন পার্কিং সব মিলিয়ে প্রতিদিন বাড়ছে যানজটের তীব্রতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তা আর বাজারের মধ্যে পার্থক্যটাই উঠে গেছে। জনমনে এখন বড় প্রশ্ন, এই বাজারগুলো গড়ে উঠছে কীভাবে? কার অনুমতিতে? কোথায় তাদের লাইসেন্স? কোথায় অনুমোদনের নথি?
আদৌ কোনও নগর পরিকল্পনার আওতায় কি এগুলি চলছে? ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শহরজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে বাজার, অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেই কোনও নিয়ন্ত্রণ, নেই কোন স্থায়ী কোন উচ্ছেদ অভিযান, নেই নজরদারি। বরং দিন দিন বাড়ছে এই দখলদারির বিস্তার।
এক প্রবীণ নাগরিক বলেন, যেখানে সরকারি বাজার রয়েছে, সেখানে রাস্তা দখল করে আলাদা বাজার বসার প্রয়োজন কী? এটা তো প্রকাশ্য অরাজকতা। দীর্ঘদিন ধরেই শিলচরের যানজট সমস্যার জন্য অপরিসর রাস্তা, বাড়তি যানবাহন এবং ট্রাফিক বিশৃঙ্খলাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এখন অবৈধ বাজারও সেই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
কারণ, শুধু বাজার বসছে তাই নয়, ক্রেতাদের বাইক, স্কুটি, অটো ও চারচাকার গাড়ি রাস্তার ধারে এমনকি রাস্তা দখল করেই পার্ক করা হচ্ছে। ফলে যান চলাচল আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠছে, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ন্যূনতম পদক্ষেপও দৃশ্যমান নেই। আর সেই নিষ্ক্রিয়তাই জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়াচ্ছে।
শহর পরিচালনা কেবল রাস্তা বানানো বা কর আদায় নয়, নাগরিক চলাচল, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের সাংবিধানিক দায়। সেই দায় পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ আজ তীব্রভাবে উঠছে শিলচরে। শিলচরের মানুষ এখন উত্তর চাইছেন, কার ছত্রছায়ায় চলছে এই অবৈধতার সাম্রাজ্য? কেন শহরকে পণবন্দি করা হয়েছে? প্রশ্নগুলো আর শুধু সাংবাদিকতার নয়, জনস্বার্থের। আর সেই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে প্রশাসনকে। (চলবে)


