বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলছেন, ভিন রাজ্যে গিয়ে কড়া বার্তা দিচ্ছেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবিতে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সেই জিরো টলারেন্স কি বরাক উপত্যকার সীমান্তে এসে থমকে যাচ্ছে? কারণ মাঠপর্যায়ের চিত্র যেন তার সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে। বরাক উপত্যকায় বহুবার আলোচনায় উঠে এসেছে অবৈধ বার্মিজ সুপারি পাচারের অভিযোগ।
নানা অভিযান, জব্দ, বিবৃতি আর প্রশাসনিক হুঙ্কারের মাঝেও যে সিন্ডিকেট ভেঙে পড়েনি, বরং আরও সংগঠিত হয়েছে, সাম্প্রতিক কাটাখালের ঘটনায় সেই অভিযোগ ফের নতুন মাত্রা পেল। স্থানীয়দের অভিযোগ, মিজোরাম থেকে লায়লাপুর গেইট পার হয়ে কালাইনের দিগরখাল টোল গেইট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বহিঃ রাজ্যে বার্মিজ সুপারি এই রুট এখন আর গোপন কিছু নয়। বরং এটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত পাচার করিডর। পথে পথে নাকা চেকিং থাকলেও অভিযোগ, তা সাধারণ যানবাহনের জন্য কড়া, কিন্তু প্রভাবশালী চক্রের ওভারলোড লরি এলেই অদৃশ্য হয়ে যায় নজরদারি।
অভিযোগের কেন্দ্রে এবার কাটাখাল পুলিশ ফাঁড়ি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ ফাঁড়ির অদূরে রেলওয়ের হাই ভোল্টেজ গেটের নীচে সুপারি বোঝাই একটি লরি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। অভিযোগ, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রকাশ্য দিবালোকে এক লরি থেকে অন্য লরিতে বস্তা বদলের কাজ চলে। অথচ পুলিশি হস্তক্ষেপের কোনও দৃশ্যমান চিহ্ন ছিল না।
কাটাখালে পুলিশের নাকের ডগায় ম্যানেজ রাজ! অবৈধ বার্মিজ সুপারি সিন্ডিকেটে বরাকে ফের সক্রিয়
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, যেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি কয়েক হাত দূরে, সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন কার্যকলাপ চলল কীভাবে? এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, এটা যদি পুলিশের অগোচরে হয়, তবে সেটা অযোগ্যতা। আর যদি চোখের সামনে হয়, তবে সেটা আরও গুরুতর। এই অভিযোগ এখন শুধু উদাসীনতার প্রশ্নে আটকে নেই, উঠছে মদত, যোগসাজশ এবং ম্যানেজ রাজ এর অভিযোগও।
ঘটনায় নাটকীয় মোড় আসে যখন ওভারলোড লরিটি হাই-ভোল্টেজ গেটের সঙ্গে ধাক্কা খায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ধাক্কার পর লরি থেকে রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে বিপুল পরিমাণ সুপারি। মুহূর্তেই জড়ো হন স্থানীয় মানুষ। কেউ প্লাস্টিকে, কেউ কাপড়ে কুড়িয়ে নেন ছড়িয়ে থাকা সুপারি। এক স্থানীয় মহিলার সরল মন্তব্য, রাস্তায় পড়ে ছিল, তাই নিয়েছি। কিন্তু এই সরলতার আড়ালে উঠে আসে বড় প্রশ্ন, কীভাবে এমন অবৈধ মাল জনসমক্ষে রাস্তার ধুলোয় গড়াগড়ি খায়, অথচ প্রশাসন নির্বিকার থাকে?
ঘটনার সবচেয়ে বিস্ফোরক দিক উঠে আসে লরি চালকের বক্তব্যে। স্থানীয় সাংবাদিকদের সামনে চালকের দাবি, সব সিন্ডিকেটের মাল… কিছু হবে না… সব ম্যানেজে চলছে। কারণ সমালোচকদের মতে, একজন চালক তখনই এমন দম্ভ দেখাতে পারে, যখন তার পেছনে শক্তিশালী রক্ষাকবচ থাকে। প্রশ্ন উঠছে, এই আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়? শুধুই গুজব, না কি এর নেপথ্যে সত্যিই রয়েছে বহুস্তরীয় মদতের জাল?
স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ, এমন একটি লরি বহু নাকা, ফাঁড়ি ও নজরদারি পয়েন্ট পেরিয়ে কাটাখালে পৌঁছল, অথচ কোথাও কোনও বাধা পড়ল না। প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে এই কারণে যে, সাধারণ নাগরিকের ছোটখাটো নথিপত্র নিয়ে যেখানে কড়াকড়ি দেখা যায়, সেখানে কথিত অবৈধ মালবোঝাই লরি নির্বিঘ্নে চলাচল করছে, এই বৈপরীত্যে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে।
হাই-ভোল্টেজ গেটের নীচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লরি থেকে লরিতে মাল বদল, প্রশাসনিক মদতের অভিযোগে তোলপাড়
এলাকার বহু মানুষের বক্তব্য, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এক বৃহত্তর সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। এক যুবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সবাই জানে কোথা দিয়ে মাল আসে, কারা নামায়, কোথায় যায়। শুধু প্রশাসনই জানে না, এটা মানুষ আর বিশ্বাস করে না। সমালোচকদের মতে, একদিকে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে এমন অভিযোগ, এই দ্বৈত বাস্তবতাই প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঘটনার পর বিভিন্ন মহলে দাবি উঠেছে, কাটাখালের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। ওই লরি কোথা থেকে এল, কার মাল ছিল, কীভাবে এতদূর পৌঁছল, কেন পুলিশি হস্তক্ষেপ দেখা গেল না, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর চায় মানুষ। একইসঙ্গে স্থানীয়দের দাবি, শুধুমাত্র ছোটখাটো জব্দ বা প্রতীকী অভিযান নয়, পুরো সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে দায়বদ্ধতা ঠিক করতে হবে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত।
কারণ, অভিযোগ যদি সত্যি হয়, তবে এটি শুধু একটি পাচারের ঘটনা নয়, এটি আইনের শাসন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা তিনটিকেই একসঙ্গে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। বরাকের মানুষ এখন দেখছে, এই অভিযোগের জবাব আসে কি না, নাকি ম্যানেজ রাজ এর গল্প আবারও ফাইলবন্দি হয়ে যায়।


