জাতীয় সড়ক না মৃত্যুফাঁদ? শ্রীভূমির বেহাল রাস্তায় চরম দুর্ভোগ, বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা

প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট-বড় যানবাহন এই পথ দিয়ে চলাচল করলেও সড়কের এই বেহাল চিত্র দেখে প্রশ্ন উঠছে, এটি আদৌ জাতীয় সড়ক, নাকি প্রশাসনিক অবহেলার প্রতীক? স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুদিন ধরেই এই রাস্তার দুরবস্থা নিয়ে বারবার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কার্যকর কোনও সংস্কার উদ্যোগ চোখে পড়েনি। সামান্য জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বরং দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে সড়কটি।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকরা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী ছাত্রছাত্রীরা এই ভাঙাচোরা রাস্তায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছে। বিশেষ করে মোটরবাইক, সাইকেল কিংবা অটোতে যাতায়াতকারী পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার আশঙ্কা আরও বেশি। স্থানীয়দের বক্তব্য, যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এক অভিভাবক প্রকাশ করে বলেন, সন্তান স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে নিরাপদে ফিরবে কি না সেই চিন্তায় প্রতিদিন থাকতে হয়। রাস্তার এই অবস্থা আর কতদিন চলবে?

শুধু পড়ুয়ারা নয়, রোগী পরিবহণেও এই সড়ক এখন বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ, হাসপাতালে রোগী নিয়ে যাওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঠিকমতো চলাচল করতে পারছে না। গর্ত এড়াতে গিয়ে গতি কমে যাচ্ছে, অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠছে। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

স্থানীয় ভুক্তভোগী মানুষ হতাশার সুরে বলেন, একটি জাতীয় সড়কের এই অবস্থা শুধু দুর্ভোগের নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার প্রশ্ন। কারণ অতিরিক্ত গর্ত, অসমতল রাস্তা এবং ভাঙাচোরা পিচের কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষত বর্ষাকালে এই বিপদ আরও ভয়াবহ আকার নেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের

অভিযোগ, খারাপ রাস্তার কারণে বাজার এলাকায় যানজট বেড়েছে, পণ্য পরিবহণ ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ছে। প্রতিদিন যানবাহন বিকল হওয়া, টায়ার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ছোটখাটো দুর্ঘটনা এসব যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো যদি এই অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারি কোথায়? দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলি কি শুধু কাগজে-কলমেই সক্রিয়?

স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করে বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়ে, ফলে সেগুলো চোখে পড়ে না, আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। বাইক আরোহী থেকে ছোট গাড়ি, কেউই এই ফাঁদ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনার খবর মিলছে, কিন্তু তবুও যেন নড়ছে না প্রশাসন। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিশ্রুতির অপূর্ণতা।

অসম সরকারের মন্ত্রী তথা শ্রীভূমির সন্তান কৃষ্ণেন্দু পাল কয়েকদিন আগেই এই বেহাল সড়ক মেরামতের জন্য মাত্র দশ দিনের সময়সীমা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনও প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। বরং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সড়কের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। ফলে মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়েছে প্রবল হতাশা ও ক্ষোভ।

এই প্রসঙ্গে শ্রীভূমি জেলা কংগ্রেস সভাপতি তাপসকান্তি পুরকায়স্থ্য সরাসরি প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, এতদিন ধরে সড়কের এমন করুণ অবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাসকদল প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না, এ যেন এক প্রহসন।

তিনি আরও বলেন, যদি কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে এই বেহাল সড়ক সংস্কারের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে রাজনৈতিক পাল্টা প্রতিশ্রুতির এই খেলায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যে কমছে না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। শহরবাসীর একাংশের প্রশ্ন, একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়কের এই অবস্থা কীভাবে এতদিন ধরে চলতে পারে?

নিয়মিত পরিদর্শন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত সংস্কারের যে প্রক্রিয়া থাকা উচিত, তা কি আদৌ কার্যকর রয়েছে? নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার ফলেই এই দুরবস্থা? সড়কের এই অবস্থা শুধুমাত্র যাতায়াতের সমস্যা নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। দ্রুত সংস্কার না হলে বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এখন প্রশ্ন একটাই, আর কতদিন? আর কত দুর্ঘটনা ঘটলে প্রশাসনের টনক নড়বে? প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, এবার প্রয়োজন দৃশ্যমান কাজের। শ্রীভূমির মানুষ আর আশ্বাস নয়, নিরাপদ সড়কই চায়, এটাই আজকের সবচেয়ে জোরালো দাবি। শহরবাসীর দাবি, অবিলম্বে এই সড়কের পূর্ণাঙ্গ মেরামত ও সংস্কার করা হোক। শুধু গর্ত ভরাট নয়, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে টেকসই পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন বলেও মত তাদের।

কারণ, এই রাস্তা শুধু যাতায়াতের পথ নয়, এটি হাজারো মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। আর সেই পথ যদি প্রতিদিন আতঙ্ক আর দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বয়ে আনে, তবে তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখন দেখার, প্রশাসন এই আর্তি শুনবে, নাকি দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থেকে আবারও কোনও বড় বিপর্যয়ের পর নড়েচড়ে বসবে।

Related Posts

হাইলাকান্দির শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত!

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ হাইলাকান্দি জেলার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ এবার প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হল। অবৈধ বেসরকারি বিদ্যালয়ের দৌরাত্ম্য, শিক্ষা প্রশাসনে কথিত দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ…

বরাকে কি অবৈধ বার্মিজ সুপারি পাচারকারীদের অভয়ারণ্য? কাটাখাল কাণ্ডে চাঞ্চল্য

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলছেন, ভিন রাজ্যে গিয়ে কড়া বার্তা দিচ্ছেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবিতে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছেন।…