বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৬ এপ্রিলঃ প্রায় আড়াই বছর আগে কাছাড় জেলার কচুদরম থানা এলাকার বাউরিকান্দি প্রথম খণ্ডে সংঘটিত হয়েছিল এমন এক হৃদয়বিদারক ও লোমহর্ষক ঘটনা, যা স্তম্ভিত করেছিল সমগ্র বরাক উপত্যকাকে। জন্মদাত্রী মায়ের হাতেই প্রাণ হারিয়েছিল তিন বছর বয়সী রাজিমা বেগম এবং মাত্র দশ মাসের শিশু ফাতিমা বেগম। নিষ্পাপ দুই কন্যাশিশুর সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘিরে যে শোক, ক্ষোভ ও তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, বৃহস্পতিবার তার বিচারিক পরিণতি ঘটল।
কাছাড়ের অতিরিক্ত জেলা ও সেশন বিচারক (ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট) বস্তিম শর্মার আদালত এই বহুচর্চিত মামলায় অভিযুক্ত মা আজমিরা বেগম লস্করকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তাকে।
২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বরের সেই ভোর আজও ভুলতে পারেননি বাউরিকান্দির মানুষ। যে মায়ের কোলে সন্তান সবচেয়ে নিরাপদ থাকার কথা, সেই মায়ের হাতেই দুই শিশুকন্যার মৃত্যু, এই নির্মম বাস্তবতা সে সময় গোটা এলাকা জুড়ে শিহরণ সৃষ্টি করেছিল। মামলার এজাহার ও আদালতে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত আজমিরা বেগম ছিলেন বেবুল হক লস্করের দ্বিতীয় স্ত্রী।
পুত্রসন্তানের আশায় দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন বেবুল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস, আজমিরার কোলেও আসে দুই কন্যাসন্তান রাজিমা ও ফাতিমা। প্রথম স্ত্রীর দিকেও একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তদন্তে উঠে আসে, পারিবারিক কলহ, মানসিক টানাপোড়েন এবং সন্তান জন্ম নিয়ে হতাশা, এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে আজমিরার মানসিক অবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার কিছুদিন আগে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। পরে ঘটনার প্রায় পনেরো দিন আগে ফের স্বামীর বাড়িতে ফিরে আসেন। কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেই ফেরাটা এমন এক বিভীষিকার পূর্বাভাস বহন করছিল।
ঘটনার আগের রাতে দুই কন্যাকে নিয়ে আলাদা ঘরে শুয়েছিলেন আজমিরা। ভোরে ঘুম ভাঙার পর স্বামী বেবুল ঘরে ঢুকে দেখতে পান দুই শিশু নিথর পড়ে আছে, কাপড় ভেজা, শরীর নিস্তেজ। প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি তিনি। চিৎকারে ছুটে আসেন প্রতিবেশীরা।
সোনাইয়ের কচুদরমে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুন মামলায় ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের ঐতিহাসিক রায়
তখন জিজ্ঞাসাবাদে আজমিরা নিজেই জানিয়ে দেন, দুই শিশুকে হত্যা করেছেন তিনি। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের সামনে অভিযুক্ত স্বীকার করেন, গভীর রাতে ওড়না দিয়ে দুই শিশুকে বেঁধে বাড়ির সামনের পুকুরে নিয়ে গিয়ে জলে ডুবিয়ে হত্যা করেন তিনি। পরে মৃতদেহ ঘরে এনে শুইয়ে রাখেন। একজন মা যিনি সন্তানের প্রথম আশ্রয়, প্রথম নিরাপত্তা তিনিই যখন মৃত্যুর দূত হয়ে ওঠেন, সেই ঘটনা সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল তীব্রভাবে।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আজমিরাকে গ্রেফতার করে। শুরু হয় বিস্তারিত তদন্ত। ফরেনসিক তথ্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ, পারিবারিক বয়ান এবং অভিযুক্তের স্বীকারোক্তি সবকিছু বিচার করে পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। বহু পর্যায়ের শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের পর বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণা করে আদালত। সরকার পক্ষের আইনজীবী প্রদীপকুমার পাটোয়া যুক্তি দেন, এটি শুধুই খুন নয়, এটি বিশ্বাস, মাতৃত্ব এবং মানবিকতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ।
অন্যদিকে অভিযুক্তের পক্ষে ছিলেন টি বৈদ্য। শেষ পর্যন্ত আদালত স্পষ্ট বার্তা দেয়, নিষ্পাপ শিশুদের বিরুদ্ধে এমন নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের নমনীয়তার অবকাশ নেই। এই মামলার রায় নিঃসন্দেহে বিচার ব্যবস্থার কঠোর অবস্থানকে সামনে এনেছে। কিন্তু এর সঙ্গে উঠে এসেছে আরও বড় সামাজিক প্রশ্ন। একজন মা কেন নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে এমন নির্মম হয়ে উঠলেন, এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আদালতের রায়ে মেলে না, তার উত্তর খুঁজতে হবে সমাজের ভেতরেও।
রায় ঘোষণার পর বাউরিকান্দি এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই মনে করছেন, এই সাজা দৃষ্টান্তমূলক। কেউ কেউ আবার বলছেন, এমন অপরাধে আরও কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। তবে একথা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই, রাজিমা ও ফাতিমার মৃত্যু কেবল একটি ফৌজদারি মামলা নয়, এটি মানবিকতার এক কালো অধ্যায়। বিচার হয়েছে, রায়ও এসেছে। কিন্তু দুই নিষ্পাপ শিশুর হারিয়ে যাওয়া শৈশব কি আর কখনও ফিরে আসবে? এই প্রশ্ন আজও তাড়া করে বেড়ায় কচুদরমকে।


