বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১৮ এপ্রিলঃ কে বলেছে শহরে টাকা নেই? কে বলেছে যুবকরা বেকার? বরং এখন প্রশ্নটা উল্টো এই বিপুল টাকার উৎস কোথায়? কাছাড়ের সদর শহর শিলচর এবং আশপাশের শহরতলীর অলিগলিতে রাত নামলেই যেন খুলে যায় এক অদৃশ্য অর্থনীতির দরজা। নাম তার আইপিএল জুয়া। চকচকে আলো, টেলিভিশনের পর্দায় উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ আর ক্রিকেটপ্রেমের আবেগ সবকিছুর আড়ালে নীরবে, কিন্তু দ্রুত বিস্তার ঘটছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ জুয়ার কারবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পাড়ায় গোপন আসর বসছে। মোবাইল অ্যাপ, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং নির্দিষ্ট বুকিদের মাধ্যমে চলছে এই বেটিং চক্র। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই জুয়ার জালে জড়িয়ে পড়ছে শহরের বিপুল সংখ্যক যুবক। কেউ সহজে টাকা আয়ের আশায়, কেউ আবার একবারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গিয়ে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে ঋণের জালে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ী কেউই এই প্রলোভন থেকে মুক্ত নয়।
চাকরি নয়, জুয়ার টেবিলে ভবিষ্যৎ! সহজে অর্থ উপার্জনের লোভে নিজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে যুবসমাজ
একাধিক অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের অভিযোগ, এই অবৈধ জুয়ার আসর এখন প্রায় প্রকাশ্যে চলছে গোপনীয়তা নেই বলেই চলে। শহরের বিভিন্ন মোড়ে কান পাতলেই শোনা যায় গুঞ্জন শোনা যায়।। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। তাঁদের অভিযোগ, শহরের বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রকে ঘিরেই চলছে এই জুয়ার আসর, যা আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। অভিযোগ আরও রয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের কিছু ব্যক্তি, যার ফলে সহজে আইনের জাল এড়িয়ে যাচ্ছে মূল চক্রীরা। মাঝেমধ্যে ছোটখাটো ধরপাকড় হলেও মূল সর্দারা থেকে যাচ্ছে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সামাজিক বিশ্লেষকরা তাদের মত প্রকাশ করে বলেন, এই ধরনের জুয়ার প্রসার কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। যুবসমাজের একাংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের মোহে নিজের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। এদিকে, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কবে বন্ধ হবে এই আইপিএল জুয়ার রমরমা? কবে দৃশ্যমান হবে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ? না কি ক্রিকেটের উত্তেজনার আড়ালে চলতেই থাকবে এই যুব সমাজকে ধংস করার খেলা? শিলচরের রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে, আলো ঝলমলে পর্দার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিপজ্জনক এক সামাজিক সংকট।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আড়ালে গোপন নেটওয়ার্ক, বহিঃ রাজ্য থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী চক্র
স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই জুয়া চক্র শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত এবং বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক, যা পরিচালিত হচ্ছে রাজ্যের বাইরের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ উঠেছে, এই চক্রের মূল যোগসূত্র রয়েছে রাজস্থানের এক রহস্যময় ব্যক্তির সঙ্গে, যাকে ‘বাবা’নামে চেনে সকলে। তার নির্দেশেই নাকি গোটা নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়, আর শিলচরে রয়েছে একাধিক স্থানীয় সহযোগীযারা “শেয়ার পার্টনার”হিসেবে কাজ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বসে এই শেয়ার পার্টনাররা পরিচালনা করছে অনলাইন জুয়ার লেনদেন। শিলচরের ২য় লিংক রোডের সানি পাল, নয়নদ্বীপ পাল ও তৃতীয় লিংক রোডের সমীর দাস এবং শরৎপল্লী এলাকার তপন সূত্রধরসহ কয়েকজনের নাম ঘিরে ইতিমধ্যেই চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রশাসনিকভাবে যাচাই হয়নি, তবুও স্থানীয় মহলে বিষয়টি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই জুয়ার নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় অস্ত্র মোবাইল অ্যাপ। “Suryax777” এবং “JUAEXCH” নামের দুটি অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ, এমনকি কোটি টাকার বাজি ধরা হচ্ছে বলে দাবি। নগদের বদলে এখন লেনদেন হচ্ছে সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে। কোডওয়ার্ড, গোপন আইডি এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এমনভাবে এই সিস্টেম গড়ে তোলা হয়েছে, যা সাধারণ নজরদারির পক্ষে প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে শহরের যুবসমাজ। দ্রুত টাকা রোজগারের প্রলোভন, কর্মসংস্থানের অভাব, আর সহজ প্রযুক্তির হাতছানি সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ সামাজিক বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই প্রবণতা। যে বয়সে তরুণদের ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই বয়সেই তারা ঢুকে পড়ছে এক অনিশ্চিত, অবৈধ এবং বিপজ্জনক জগতে।
প্রশাসন কি শীত ঘুমে, নাকি নীরব দর্শক?
প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। কাছাড় জেলার সাইবার ক্রাইম সেল কি এই ধরনের অপরাধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ? নাকি প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই চক্রকে ধরার মতো সক্ষমতা বা সদিচ্ছা দুটোরই অভাব রয়েছে? আরও বড় প্রশ্ন, এই বিপুল অঙ্কের লেনদেন কি সম্পূর্ণ নজর এড়িয়ে সম্ভব, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনও অদৃশ্য সুরক্ষা বলয়? আইন অনুযায়ী, অনলাইন জুয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
তবুও যদি প্রকাশ্যে এই ধরনের কার্যকলাপ চলতে থাকে, তাহলে তা শুধু আইনের ব্যর্থতা নয়, বরং প্রশাসনিক শৈথিল্যেরও স্পষ্ট প্রমাণ। এখন সময় এসেছে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রয়োজন গভীর তদন্ত, প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুবসমাজকে এই বিপজ্জনক পথ থেকে সরিয়ে আনার জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। কারণ, যদি চাকরি আর জুয়া এই দুইয়ের সীমারেখা মুছে যেতে শুরু করে, তাহলে শুধু একটি শহর নয়, গোটা সমাজই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়বে এক গভীর অন্ধকারে। আজ প্রশ্ন শুধু আইনের নয়, এটা শিলচরের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।


