বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১৮ এপ্রিলঃ সংখ্যার হিসেবে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারল না কেন্দ্রীয় সরকার। বহু প্রতীক্ষিত মহিলা সংরক্ষণ ও লোকসভায় আসনবৃদ্ধি সংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল লোকসভায় পাশ করাতে ব্যর্থ হল নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার। টানা দুদিনের উত্তপ্ত বিতর্কের পর শুক্রবার বিকেলে হওয়া ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়ে ২৯৮টি ভোট, বিপক্ষে ২৩০টি। মোট ৫২৮ জন সাংসদের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন না পাওয়ায় বিলটি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। এই ফলাফল শুধু একটি বিলের ব্যর্থতা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজনরেখা আরও স্পষ্ট করে দিল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নারী সংরক্ষণ বিলে রাজনৈতিক সংঘাত, লোকসভায় মুখ থুবড়ে কেন্দ্র
তিন দিনের বিশেষ অধিবেশনে কেন্দ্র তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাশ করানোর পরিকল্পনা নেয়। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের পেশ করা বিলগুলির মধ্যে ছিল, প্রস্তাবিত ১৩১তম সংশোধনী বিল, যা ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’নামে পরিচিত, তার মাধ্যমে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভায় মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ এবং লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৮৫০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। একইসঙ্গে ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের পথও প্রশস্ত করার কথা বলা হয়। কিন্তু বিরোধীদের অভিযোগ, মহিলা সংরক্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে রেখে সরকার আসলে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে আসনবৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে।
সরকারের সাফাই, মহিলা সংরক্ষণে বড় ধাক্কা, লোকসভায় ভেস্তে গেল কেন্দ্রের পরিকল্পনা
বিতর্কের শেষ পর্যায়ে সরকারপক্ষের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের সরাসরি ‘মহিলা বিরোধী’বলে আক্রমণ করেন। তাঁর যুক্তি, দেশের বহু লোকসভা কেন্দ্রে ভোটারের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, কোথাও তা ৪৮ লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা একজন সাংসদের পক্ষে সামলানো অত্যন্ত কঠিন। তাই আসনবৃদ্ধি সময়ের দাবি। তিনি বিরোধীদের উদ্দেশে আবেদন জানান, দেশের স্বার্থে আমাদের উপর ভরসা রাখুন, বিল পাশ করতে দিন। তবে এই আহ্বানকে কার্যত অগ্রাহ্য করে বিজেপিবিরোধী জোট ইন্ডিয়া। বিরোধীরা তাদের অবস্থানে অনড় থেকে ভোটাভুটিতে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের অভাবে ব্যর্থ ১৩১তম সংশোধনী, বিরোধীদের কড়া অবস্থানে পাস হল না নারী সংরক্ষণ বিল
বিতর্কের এক পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে ওঠে। অমিত শাহ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করে মন্তব্য করেন, সংসদে বক্তব্য রাখার শৈলী তাঁর বোন প্রিয়ঙ্কা গান্ধীর কাছ থেকে শেখা উচিত। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংসদে হইচই শুরু হয় এবং বিরোধীরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
বিরোধীদের বড় আশঙ্কা: নারী সংরক্ষণকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন আরও প্রকট
বিরোধীদের মূল আপত্তির জায়গা ছিল ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবসহ একাধিক বিরোধী নেতা দাবি করেন, জনগণনার আগে আসন পুনর্বিন্যাস করা হলে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমে গিয়ে উত্তর ভারতের প্রভাব বাড়তে পারে, যেখানে বিজেপির সংগঠনগত শক্তি তুলনামূলক বেশি।
লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী আরও একধাপ এগিয়ে অভিযোগ করেন, দেশের ভোট মানচিত্র বদলানোর চেষ্টা চলছে, যেমন অসমে হয়েছে। আমরা তা সফল হতে দেব না। তিনি ওবিসি ও দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন।
দুই-তৃতীয়াংশের ঘাটতিতে ব্যর্থ কেন্দ্র, তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত, নতুন করে অনিশ্চয়তা নারী সংরক্ষণ নিয়ে
বিরোধীরা আরও প্রশ্ন তোলে, ২০২৩ সালে পাস হওয়া ১০৬তম সংবিধান সংশোধনী যার মাধ্যমে মহিলা সংরক্ষণের পথ খোলা হয়েছিল, সেই আইন অনুযায়ী জনগণনার পর আসন পুনর্বিন্যাস করে তবেই সংরক্ষণ কার্যকর হওয়ার কথা। তাহলে সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে কেন নতুন করে দুটি পৃথক বিষয় সংরক্ষণ ও আসনবৃদ্ধি একত্রিত করা হল? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর সরকার দিতে পারেনি বলেই অভিযোগ বিরোধীদের। উল্লেখযোগ্যভাবে, বিতর্ক চলাকালীনই কেন্দ্র ওই ১০৬তম সংশোধনী আইনের কার্যকারিতা ঘোষণা করে। আইন মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৬ এপ্রিল থেকেই তা কার্যকর হয়েছে।
মোদীর আবেগঘন আবেদনও ব্যর্থ
ভোটাভুটির আগে সামাজিক মাধ্যমে দেশবাসীর উদ্দেশে আবেদন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি লেখেন, দেশের নারীশক্তির সেবা করার এটি একটি বড় সুযোগ। তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন না। চার দশকের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে মহিলা সংরক্ষণ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আবেগঘন আবেদনও সংসদের কঠিন অঙ্কে কাজ করল না।
রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ, অনিশ্চয়তায় মহিলা সংরক্ষণ
১৩১তম সংশোধনী বিল ব্যর্থ হওয়ায় পরবর্তী ডিলিমিটেশন ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আসন বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিলগুলিও আর ভোটাভুটির মুখ দেখেনি। ফলে মহিলা সংরক্ষণ ও আসনবৃদ্ধি দুই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই আপাতত অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে মেরুকরণ স্পষ্ট। একদিকে নারী সংরক্ষণের প্রশ্নে নৈতিক চাপ, অন্যদিকে ক্ষমতার অঙ্ক এই দ্বন্দ্বই এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ব্যর্থতা শুধু সরকারের জন্য ধাক্কা নয়, বরং আগামী নির্বাচনের আগে এক বড় ইস্যু হয়ে উঠতে চলেছে, যেখানে মহিলা ভোটারদের মন জয়ই হতে পারে আসল চাবিকাঠি।


