মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে ভরাডুবি পয়লাপুল নেহেরু স্কুলে, ২০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৩ জন উত্তীর্ণ

অসংখ্য কৃতী ছাত্র-ছাত্রী এই প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাফল্যের নজির গড়েছেন। কিন্তু এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল যেন সেই গৌরবময় অতীতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, মোট ২০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।

পাশের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬.৪ শতাংশে। এই পরিসংখ্যান শুধু হতাশাজনকই নয়, বরং একটি গভীর শিক্ষাগত সংকটের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মত শিক্ষাবিদদের। এমন ফলাফল যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যই উদ্বেগজনক, আর একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি চিন্তার বিষয়।

অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে স্কুলের পাঠদানের মান ধীরে ধীরে অবনতি ঘটেছে। নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, পর্যাপ্ত শিক্ষক সংকট, পর্যবেক্ষণের অভাব এই সব বিষয়ই ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তাঁদের দাবি। অন্যদিকে, শিক্ষকদের একটি অংশের মতে, ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি কমে যাওয়া, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হ্রাস এবং পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবও এই ফলাফলের জন্য দায়ী। শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিকে শুধুমাত্র একটি বছরের ব্যতিক্রম বলে এড়িয়ে গেলে চলবে না।

প্রয়োজন গভীরভাবে কারণ অনুসন্ধান এবং দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ। স্কুল প্রশাসন, শিক্ষা দপ্তর এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই ব্যর্থতার দায় কে নেবে? এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে আবার তার পুরনো গৌরবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? শুধু সমালোচনা নয়, এখন প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ, একটি স্কুলের ফলাফল শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন, আশা এবং সম্ভাবনা।

উত্তীর্ণদের মধ্যে প্রথম বিভাগে রয়েছেন ৫ জন, দ্বিতীয় বিভাগে ৭ জন এবং তৃতীয় বিভাগে মাত্র ১ জন। মোট লেটার মার্কস পেয়েছে ১০টি। পাশাপাশি প্রায় ৬০ জন পরীক্ষার্থী কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, যা পরিস্থিতির গভীরতা আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই চরম ভরাডুবি নিয়ে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিমানিস পুরকায়স্থ স্পষ্টভাবেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এমন ফলাফল আমরা কল্পনাও করিনি। গত বছরও পাশের হার ছিল ৪৯ শতাংশ। হঠাৎ এমন পতন সত্যিই চিন্তার বিষয়। তবে তিনি এর পেছনে একাধিক কারণ তুলে ধরেন।

স্কুলে প্রায় ১৫০০ ছাত্রছাত্রী থাকলেও বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা মাত্র ২৮। এর মধ্যে ১৩ জন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে, ফলে তারা মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সময় পাঠদান করতে পারেননি। এছাড়া, স্কুলের পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ চলছে, যার ফলে অস্থায়ী ভবনে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে পঠনপাঠন চালাতে হচ্ছে। এই পরিকাঠামোগত সংকটও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি তাঁর।

তবে এসব কারণ তুলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত দায় এড়াতে চাননি তিনি। তাঁর কথায়, যাই হোক, ফলাফল যখন এতটা খারাপ হয়েছে, দায় তো আমাদেরই নিতে হবে। বাইরে কেউ এই ব্যাখ্যা শুনতে চাইবে না। স্কুল পরিচালন সমিতির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন লক্ষীপুরের বিধায়ক তথা মন্ত্রী কৌশিক রায়। তবে এই ফলাফল নিয়ে তাঁর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিভিন্ন মহলে। যদিও অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, মন্ত্রী সবসময় স্কুলের খোঁজখবর রাখেন, কিন্তু শিক্ষাদানের দায়িত্ব তো আমাদেরই।

অন্যদিকে, স্কুলের প্রাক্তন সভাপতি ও বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা প্রদীপ কুমার দে এই ফলাফলকে একেবারেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, এই স্কুলের ঐতিহ্য ও গৌরবকে ফিরিয়ে আনতে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। এভাবে ফলাফল ভেঙে পড়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এখন প্রশ্ন উঠছে, শুধু পরিকাঠামো বা শিক্ষক ঘাটতির অজুহাত দিয়ে কি এই বিপর্যয়কে ব্যাখ্যা করা যায়? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরিকল্পনার অভাব? শিক্ষামহলের একাংশের মতে, সময়মতো প্রস্তুতি, নিয়মিত মনিটরিং ও শিক্ষার্থীদের প্রতি যথাযথ নজরদারির অভাবই এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।

পয়লাপুল এলাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পিএমশ্রী নেহেরু হাইয়ার সেকেন্ডারি স্কুল এর এবারের বিপর্যয়কর ফলাফল ঘিরে এখন তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে শিলচর এর শিক্ষামহলে। একসময় যে প্রতিষ্ঠান সাফল্যের ধারাবাহিকতায় নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছিল, সেই স্কুলের বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সকলের কাছে। এই প্রেক্ষাপটে স্কুল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই নড়েচড়ে বসেছে। ফলাফলের পিছনে থাকা কারণগুলি খতিয়ে দেখতে শুরু হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া।

পরিচালন সমিতির সদস্যরাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। কোথায় ঘাটতি, কীভাবে শিক্ষার মান পুনরুদ্ধার করা যায়, এবং ভবিষ্যতে কীভাবে এই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব এসব বিষয় নিয়েই এখন চলছে বিস্তৃত আলোচনা। তবে বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। এক বছরের খারাপ ফলাফল শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শত শত ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ, তাঁদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। এই ব্যর্থতার প্রভাব শুধু বর্তমানেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে তা শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। দায় এড়িয়ে গিয়ে বা সাময়িক সমাধানের পথে না হেঁটে, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। পাশাপাশি, শিক্ষক-অভিভাবক প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলেই মনে করা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন একটাই পয়লাপুল নেহেরু স্কুল কি আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে? নাকি এবারের এই ধসই ভবিষ্যতের এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সূচনা হয়ে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, এখনই সঠিক পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই শিলচরের শিক্ষামহল আজ অপেক্ষা করছে শুধু আশ্বাসের নয়, কার্যকর পরিবর্তনের।

Related Posts

উদ্বোধনের রং শুকোতেই ভাঙছে ছয় নম্বর জাতীয় সড়ক, পাঁচ মাসেই বেহাল অবস্থা, প্রশ্নের মুখে নির্মাণের গুণগতমান

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১৮ এপ্রিলঃ মাত্র পাঁচ-ছয় মাস আগেই যে ছয় নম্বর জাতীয় সড়ককে ঘিরে ছিল উন্নয়নের ঢাকঢোল, ফিতা কাটা আর বড় বড় আশ্বাস  আজ সেই রাস্তাই যেন এক নির্মম বাস্তবতার…

শিলচর ক্যান্সার হাসপাতালের প্রবেশদ্বারেই মরণফাঁদে পরিণত!

বরাকবাণী ডিজিটাল শিলচর ১৮ এপ্রিলঃ শিলচরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রের প্রবেশপথ আজ চরম অব্যবস্থার এক জীবন্ত নগ্ন দৃশ্য। শিলচর এর ক্যান্সার চিকিৎসা পরিষেবার প্রধান ভরসা শিলচর ক্যান্সার হাসপাতাল এর…